বিরোধী দলকে দুর্বল করার প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘একটা চমৎকার প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করছি। প্রায় সকলেই কুচিকুচি করে কাটার পরে বলেন, এগুলো ছাড়েন, আমাদের সঙ্গে চলে আসেন। আমরা ওই কুচিকুচি করার জন্য আসি নাই।’ সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা সমাপনী বক্তব্যে এ কথা বলেন। স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের এই বাজেট অধিবেশন শুরু হয়।
বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে, সরকারি দল যা চাইবে, বিরোধী দল সেটাই সমর্থন করবে। আবার বিরোধিতার খাতিরে সবকিছুর বিরোধিতাও করা উচিত নয়।’ তিনি জাতীয় সংসদকে সরকারি দল ও বিরোধী দল রূপী দুই ‘চাকার’ ওপর চলা একটি যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, যেকোনো একটা টায়ার অকেজো বা ফুটো হয়ে গেলে যান চলবে না। সরকারি দলকে বিরোধী দলকে সম্মান করার মানসিকতা রাখতে হবে, আর বিরোধী দলেরও সংগত সকল বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা করার মানসিকতা থাকতে হবে। অতীতের তোষামোদ, ব্যক্তিপূজা ও চরিত্রহননের রাজনীতি থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান জামায়াতের আমির।
বাজেট বক্তৃতায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগে বিদ্যমান হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরও রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে তাদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে বাজেটে বরাদ্দ এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি। এছাড়া দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব করেন।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে বাজেটে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘গত সাড়ে ১৫ বছরে যে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, ওই পাচার অর্থের নয় ভাগের এক ভাগও যদি আগামী অর্থবছরে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে আমাদের কোনো বাজেট ঘাটতি থাকবে না।’ তিনি সম্পদের পাশাপাশি অপরাধীদেরও দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে এবং প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে সংসদের অধীনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের চাপ কমিয়ে একটি মাত্র ট্যাক্স নির্ধারণের আহ্বান জানান তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি অতীতে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ও নির্যাতিতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তোলেন জামায়াতের আমির। বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রতি তিন বা চার মাস অন্তর অগ্রগতি সংসদে উপস্থাপনের এবং অর্থবছর জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার প্রস্তাব দেন তিনি।
বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের চার লেন প্রকল্প দ্রুত শেষ করা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান, ভোলা সেতু নির্মাণ এবং প্রধান নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীনের সহযোগিতায় নেওয়া মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা নামের কাঙাল নই, আমরা কাজের কাঙাল। কাজটাই দেখতে চাই।’ সবশেষে তিনি অতীতের গ্লানি থেকে বের হয়ে যুবকদের স্বপ্নের বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।