শক্তিশালী ভূমিকম্পে ধসে পড়া বহুতল ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে দীর্ঘ ২৪ ঘণ্টা আটকে ছিলেন ভেনেজুয়েলার বাসিন্দা দায়ানা পাতিনো। আর এই পুরোটা সময় যমদূতকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও কোলের ১৮ দিন বয়সী নবজাতককে নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছিলেন তিনি। মা ও শিশুর এই অলৌকিকভাবে বেঁচে থাকার রোমাঞ্চকর ঘটনাটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দায়ানা তাঁর সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বিনিময় করেছেন বিবিসির সাংবাদিকের সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁর ছোট্ট সন্তান হুয়ান ডেভিডই তাঁকে ধ্বংসস্তূপের নিচেও সজাগ থাকার ও লড়াই করার শক্তি দিয়েছিল। দায়ানা বলেন, ‘যতক্ষণ ও বেঁচে ছিল, আমার মনে হচ্ছিল আমিও বেঁচে আছি এবং আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। ও ঠিকমতো শ্বাস নিচ্ছে কি না তা নিশ্চিত হতে অন্ধকারের মধ্যে আমি বারবার ওর নাকে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতাম।’
ভয়াবহ সেই ভূমিকম্পের সময় দায়ানা দেশটির উত্তর উপকূলীয় অঞ্চল লা গুয়াইরাতে একটি বহুতল ভবনের ৮ম তলায় থালাবাসন ধোয়ার কাজ করছিলেন। হঠাৎ কম্পন শুরু হলে প্রথমে তিনি এটিকে সাধারণ ঝাঁকুনি ভেবেছিলেন। তবে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দ্রুত শিশুকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সেই আতঙ্কের মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে দায়ানা বলেন, ‘ভবনটি যখন ধসে পড়ছিল, আমার মনে হচ্ছিল যেন আমি বাতাসে উড়ছি। এরপর হঠাৎ মনে হলো তীব্র গতিতে পানি আর কাদামাটির গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি। এক পর্যায়ে একটা অন্ধকার গর্তের মধ্যে গিয়ে আছড়ে পড়ি।’
দায়ানা আরও বলেন, ‘আমি নিজেই আজ ভেবে পাই না যে বাতাসে ওড়ার সময় অত বড় ঝাঁকুনির মধ্যেও কীভাবে হুয়ানকে এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলাম। ল্যান্ড করার সময় একটি আসবাবপত্রের সঙ্গে আমার প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা লাগে।’ ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ার পরপরই তিনি ভয়ে ও আতঙ্কে চিৎকার করতে শুরু করেন। কিন্তু দ্রুতই বুঝতে পারেন চারদিকের পুরু কংক্রিটের কারণে বাইরে থেকে কেউ তাঁর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে না। এরপর দায়ানা সিদ্ধান্ত নেন, শুধু শুধু আর্তনাদ করে নিজের শক্তি ও অক্সিজেন খরচ করা উচিত হবে না। যখন আশপাশে উদ্ধারকারীদের কারও উপস্থিতি টের পাবেন, কেবল তখনই তিনি চিৎকার করবেন।
ভয়াবহ সেই পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে দায়ানা বলেন, ‘আমার বাঁ পা কংক্রিটের ভারী স্ল্যাবের নিচে চাপা পড়েছিল। একটুও নড়াচড়া করার সুযোগ ছিল না। কপাল একটি পাথরের সঙ্গে লেপ্টে ছিল।’ ধ্বংসস্তূপের ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে দায়ানা কেবল ওপরের দিকে ছোট আলোর বিন্দুর মতো কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন, যা দেখতে অনেকটা চাঁদের মতো লাগছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর হঠাৎ তিনি তাঁর ভাইয়ের গলার আওয়াজ পান। তখন তিনি বুঝতে পারেন, এবার উদ্ধার হওয়ার শেষ সময় এসেছে। দায়ানা বলেন, ‘আমি মনে মনে ভাবলাম, এটাই একমাত্র সুযোগ। ফুসফুসের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠলাম। ওপাশ থেকে আমার ভাই বলে উঠল—আমি তোদের খুঁজে পেয়েছি!’
গত বৃহস্পতিবার রাতে অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ এক উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে দায়ানা ও তাঁর নবজাতক সন্তানকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করা হয়। ভূমিকম্পের সময় তাঁর দুই পায়ে গুরুতর আঘাত লাগলেও, সৌভাগ্যবশত অলৌকিকভাবে শিশু হুয়ানের চোট মোটেও গুরুতর নয়। দায়ানার স্বামী গেরসন জানান, ভূমিকম্পের ঠিক আগমুহূর্তে বাড়ি ফিরে তিনি নিচে গাড়ি পার্ক করছিলেন। কম্পন শুরু হতেই তিনি দেয়াল টপকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সক্ষম হন এবং চোখের সামনে বহুতল ভবনটি ধসে পড়তে দেখেন। ওই সময় গেরসনের মনে হয়েছিল, তাঁর পরিবার আর বেঁচে নেই। স্ত্রী-সন্তানের এভাবে অক্ষত ফিরে আসাটা তাঁর কাছে একটি জীবন্ত ‘মিরাকল’ বা অলৌকিক ঘটনা।