১৮৬৭ সালের ঔপনিবেশিক আমলের প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭’ রহিত করে অবশেষে জাতীয় সংসদে পাস হলো যুগোপযোগী ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’। আধুনিক যুগের প্রযুক্তিনির্ভর অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল প্রতারণা এবং এর মাধ্যমে হওয়া অর্থপাচার কঠোরভাবে দমন করতে এই নতুন আইনটি আনা হয়েছে। এই আইনে সাধারণ জুয়া থেকে শুরু করে অনলাইন বেটিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ম্যাচ ফিক্সিংসহ মোট ২৪ ধরনের ডিজিটাল ও প্রচলিত অপরাধকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। একই সাথে অপরাধের গভীরতা বিবেচনা করে এতে ১৪ ধরনের কঠোর কারাদণ্ড ও কোটি কোটি টাকার অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
গত ২৩ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে বিলটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটির সুপারিশের পর মঙ্গলবার (৩০ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে বিলটি কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। বিলের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুরোনো আইনটি বর্তমান সময়ের ডিজিটাল জুয়া মোকাবিলায় সম্পূর্ণ অপ্রতুল ছিল। তাছাড়া দেশের সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে জুয়া নিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। নতুন এই আইনটি দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিশেষ করে তরুণ সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
অপরাধের ধরন ও শাস্তির বিস্তারিত সমীকরণ:
নতুন আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে সুনির্দিষ্ট ১৪ ধরনের অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির ঘোষণা করা হয়েছে, যার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
অনলাইন বেটিং (বাজি): এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়া: অনলাইন জুয়া পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড দেওয়া হবে।
বাজিকর (বুকমেকার) হিসেবে কার্যক্রম: এর শাস্তি সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড।
ভিপিএন ও মিরর সাইট ব্যবহার: ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট বা ক্লাউড অবকাঠামো ব্যবহার করে জুয়া চালালে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা জরিমানা করা হবে।
ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিং: ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হবে। পাশাপাশি দোষী ব্যক্তি ক্রীড়াঙ্গনে স্থায়ী বা সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ হবেন।
ভুয়া সিম ও এমএফএস ব্যবহার: ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম বা ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জুয়া খেললে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হবে। আর এটি যদি সংঘবদ্ধ চক্র বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে হয়, তবে সাজা বেড়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড হবে।
জুয়ার স্থান ও সামগ্রী: জুয়ার আড্ডা পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও ৪ লাখ টাকা জরিমানা এবং জুয়ার সামগ্রী তৈরি বা বিক্রির জন্য ৩ বছর কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে।
বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, শিল্পী, খেলোয়াড় বা কোনো ইনফ্লুয়েন্সার যদি জুয়ার বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা চালান, তবে তাদের সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হবে।
সাধারণ জুয়া: প্রচলিত সাধারণ জুয়া খেলার অপরাধে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা:
আইনে বলা হয়েছে, কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট গেটওয়ে বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই অপরাধ সংঘটিত হলে তার পরিচালক, ব্যবস্থাপক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পার পাবেন না। অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলসহ কর্মকর্তাদেরও সমান শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে শাস্তির পরিমাণ দ্বিগুণ হবে। এছাড়া অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত যেকোনো সম্পদ, ব্যাংক হিসাব বা ক্রিপ্টো ওয়ালেট ফ্রিজ ও বাজেয়াপ্ত করার পূর্ণ ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়েছে।
সাইবার স্পেসে ঘটা জুয়া সংক্রান্ত অপরাধের বিচার হবে দেশের সাইবার ট্রাইব্যুনালে এবং বাকি অপরাধের বিচার হবে ফৌজদারি আদালতে। এই আইনের অধীনে সমস্ত অপরাধকে ‘আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তদন্তের দায়িত্ব সাব-ইন্সপেক্টরের নিচের কোনো কর্মকর্তা পাবেন না। এছাড়া ইন্টারনেট থেকে জুয়ার সাইট, অ্যাপ, ও সোশ্যাল মিডিয়া পেজ ব্লক করার ক্ষমতা সরকারের হাতে রাখা হয়েছে। জুয়া ও অর্থপাচার রোধে একটি ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ’ তৈরি এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ‘আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স’ গঠন করার বিধানও এই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।