সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 60
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশের বৃহত্তম জলাভূমি চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল। অস্তিত্ব সংকটে দেশীয় মাছ। এই জালের মাধ্যমে নির্বিচারে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা নিধন হওয়ায় দ্রুত কমে যাচ্ছে দেশীয় মাছের উৎপাদন। ফলে জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং জেলেদের জীবিকা আজ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চলনবিলের বিভিন্ন নদী, খাল ও বিলে দিনের পাশাপাশি রাতের আঁধারেও চায়নাদুয়ারী জাল দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে। অত্যন্ত সূক্ষ্ম ফাঁসের এই জালে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ, টেংরা, পাবদা, শিং, মাগুর, কৈ, পুঁটি, খলিশা, টাকি, গজার, বোয়ালসহ অসংখ্য দেশীয় প্রজাতির ডিম ওয়ালা মা মাছ ও পোনা আটকা পড়ে। ফলে মাছ বড় হওয়ার আগেই নিধন হচ্ছে। আবার মা মাছ ধরার কারণে মাছের বংশবৃদ্ধিও হচ্ছে না।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চায়নাদুয়ারী জালের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো এটি কোনো মাছকেই ছাড় দেয় না। বড় মাছের পাশাপাশি সদ্য জন্ম নেওয়া পোনাও ধরা পড়ছে। এতে প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং যা ধারাবাহিক ভাবে দেশীয় মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে।
চলনবিলের বিভিন্ন এলাকার জেলেরা জানান, কয়েক বছর আগেও বর্ষা মৌসুমে সহজেই দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন আগের মতো মাছ মিলছে না। বাধ্য হয়ে অনেক জেলে পেশা পরিবর্তন করছেন। যারা এখনও মাছ ধরছেন, তাদের আয়ও দিন দিন কমে যাচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, চায়নাদুয়ারী জাল বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধে প্রশাসনের অভিযান নিয়মিত না হওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে এসব জাল বিক্রি করছে। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি এসব জাল ব্যবহার করায় সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতেও সাহস পান না।
পরিবেশবিদদের মতে, চলনবিল শুধু একটি জলাভূমি নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। এখানে পোনা ধ্বংস হলে শুধু চলনবিল নয়, আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মৎস্যসম্পদও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর প্রভাব পড়বে খাদ্য নিরাপত্তা ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও।
মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, আইন অনুযায়ী ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলেও জনবল সংকট এবং বিশাল জলাভূমির কারণে সব এলাকায় নজরদারি সম্ভব হয় না। তবে অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে ও সচেতন নাগরিকরা চলনবিল রক্ষায় অবিলম্বে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জালের উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এক সময় চলনবিল থেকে অনেক মূল্যবান দেশীয় মাছ চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। তাই দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে একমাত্র সমাধান।
আকাশজমিন / আরআর