স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সৌহার্দ্যের এক অনন্য নজির স্থাপন করে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫ আসনের পুঞ্জীভূত সমস্যা নিরসনে একযোগে মাঠে নেমেছে সরকার ও বিরোধী দল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় আজ বুধবার (১ জুলাই ২০২৬) উক্ত এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডের নাগরিক সংকট সরেজমিনে দেখতে দিনব্যাপী এক বিশেষ পরিদর্শন ও মতবিনিময় কর্মসূচি পরিচালনা করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এই যৌথ পরিদর্শনে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধান অতিথি ও সমন্বয়ক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
আজ সকালে পশ্চিম শেওড়াপাড়ার ৩ নম্বর গলিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে একটি উন্মুক্ত মতবিনিময় সভার মাধ্যমে এই মাঠ পর্যায়ের কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান উপস্থিত কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিনের অবহেলিত ও সংকটাপন্ন আনন্দবাজার খাল পরিদর্শন করেন। পর্যায়ক্রমে এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলটি পূর্ব মনিপুরের বাইতুর রহিম জামে মসজিদ সংলগ্ন গলি, বাইশটেকী সরকার বাড়ি মোড় এবং ইব্রাহিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণসহ ঢাকা-১৫ আসনের বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকা ঘুরে দেখেন। প্রতিটি স্পটেই তারা সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হয়ে তাদের নিত্যদিনের ভোগান্তির কথা শোনেন এবং উদ্ভূত সমস্যাগুলো সমাধানের পথ খোঁজেন।
এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের নিজ নিজ ওয়ার্ডের প্রধান প্রধান সংকটের কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে তীব্র পানি ও গ্যাস সংকট, ত্রুটিপূর্ণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্ষাকালীন জলাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের সংস্কারহীন ভাঙাচোরা রাস্তার বিষয়টি ব্যাপকভাবে উঠে আসে। এছাড়াও বিভিন্ন কাঁচাবাজারের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, যানজট নিরসনে ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বন্ধ এবং স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অতিরিক্ত ফি আদায়ের মতো নানাবিধ সামাজিক ও প্রশাসনিক সমস্যার কথা প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের জানান ভুক্তভোগী নাগরিকরা।
পরিদর্শন শেষে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, "প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের সমগ্র জনপদের নেতা হিসেবে সব এলাকার মানুষের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার লিখিত আবেদনকে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন এবং এই আসনটি যাতে কোনোভাবেই উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য বিশেষ অনুশাসন জারি করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই দিকনির্দেশনার আলোকেই আজ আমরা টিম লিডার হিসেবে এই এলাকায় এসেছি।" জাতীয় স্বার্থে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার ইতিবাচক ও সহযোগিতাপূর্ণ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, "ডা. শফিকুর রহমান জাতীয় অগ্রগতিতে সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা দেয়।" তিনি জানান, শুধু স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষে একা এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। তাই ওয়াসা, তিতাস, বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে এক টেবিলে এনে সমন্বিত ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা হবে। প্রাপ্ত সমস্যাগুলোর তথ্য সংকলন করে খুব শিগগিরই বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বসে চূড়ান্ত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
অন্য এক বক্তব্যে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, "আমরা সবসময় কেবল ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং জনগণের জীবন ও সম্পদের পাহারাদার হিসেবে আপনাদের পাশে আছি। এই পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য কোনো নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জনগণের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের একটি বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই সমাধান বের করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৩০০ আসনেরই অভিভাবক, কোনো সুনির্দিষ্ট দলের নন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই আন্তরিক উদ্যোগকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই।" তিনি সাধারণ নাগরিকদেরও সচেতন হয়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন, "দীর্ঘদিনের এই নাগরিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সব তথ্য-উপাত্ত আমাদের টিম সংগ্রহ করেছে। সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন রাস্তা, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কাজগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।" একই সঙ্গে তিনি বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে এলাকাবাসীকে সচেতন ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
এই পরিদর্শন কার্যক্রমে আরও যুক্ত ছিলেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী, প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রকিবুল হাসান, পিএসসি, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) মোহাম্মদ শওকত ওসমান, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলীসহ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, তিতাস গাস, বিদ্যুৎ বিভাগ ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধি ও কর্মকর্তাবৃন্দ।