বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে রাতটি ছিল এক অবিস্মরণীয় রেকর্ড গড়ার। তবে সমস্ত ব্যক্তিগত রেকর্ড ছাপিয়ে মাঠের আলোচনার বড় অংশজুড়ে জায়গা করে নিল নবাগত দল কেপ ভার্দের এক দুর্দান্ত ও বীরত্বপূর্ণ লড়াই। বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের মরণপণ ম্যাচে আফ্রিকার এই পুচকে দলটিকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো এই রুদ্ধশ্বাস ও শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ শেষে নিজের অতিমানবীয় অর্জনের চেয়ে প্রতিপক্ষের অকুতোভয় লড়াকু মানসিকতার কথাই বেশি শোনা গেল আলবিসেলেস্তে অধিনায়ক লিওনেল মেসির কণ্ঠে। ম্যাচ জিতেও কেপ ভার্দের এমন লড়াকু ফুটবলকে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানিয়েছেন এই ফুটবল জাদুকর।
যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে চলতি বিশ্বকাপ আসরে নিজের ব্যক্তিগত সপ্তম গোলটি করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। আর এই চোখধাঁধানো গোলের সুবাদেই ফুটবল বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এককভাবে ২০টি গোল করার এক অনন্য ও অলৌকিক মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। এত বড় বিশ্বরেকর্ড গড়ার পরেও ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে মেসির কণ্ঠে ছিল কেপ ভার্দের প্রতি অকুণ্ঠ প্রশংসা ও সম্মান। মেসি বলেন, আমরা ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে থেকেই জানতাম যে মাঠের লড়াইটা কতটা কঠিন হতে যাচ্ছে। এই দলটি যে কতটা শক্তিশালী, তা তারা গ্রুপ পর্বেই প্রমাণ করেছে। গ্রুপ পর্বে স্পেন ও উরুগুয়ের মতো বিশ্ব ফুটবলের দুই পরাশক্তিকে তারা সহজে হারতে দেয়নি, তাদের সাথে ড্র করেছে।
ম্যাচের প্রথমার্ধের কৌশল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই মহাতারকা বলেন, ম্যাচের প্রথম গোলটি করার পর আমরা ভেবেছিলাম যে এবার হয়তো আমরা আমাদের স্বাভাবিক ছন্দময় খেলাটা খুঁজে পাব এবং কিছুটা স্বস্তিতে ম্যাচটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। কিন্তু মাঠে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো চিত্র। গোল খাওয়ার পর তারা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে এবং মাঠে নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে আমাদের রক্ষণভাগকে চরম পরীক্ষার মুখে ফেলে দেয়। কেপ ভার্দের এই কঠিন লড়াইয়ের পর ফুটবল বিশ্বে আরও একবার প্রমাণিত হলো যে, বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে ছোট বা দুর্বল দল বলে আসলে কিছু নেই। মেসিও সবাইকে সেটিই মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, এটি বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব, এখানে কেউ কাউকে কোনো কিছু ফ্রি-তে বা উপহার হিসেবে দিয়ে দেবে না। আমরা সব প্রতিপক্ষকেই সমান চোখে দেখি এবং সম্মান করি।
বর্তমান বিশ্ব ফুটবলের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মেসি আরও যোগ করেন, এখনকার আন্তর্জাতিক ফুটবল অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ এবং কৌশলী। প্রতিটি দলেরই শক্তি বেড়েছে, তাই প্রতিটি ম্যাচই এখন অত্যন্ত জটিল। আমাদের দল আজ জয় পেলেও এখন প্রথম কাজ হলো ভালোভাবে বিশ্রাম নেওয়া এবং সামনে কী আসছে তা নিয়ে পরিকল্পনা করা। আজ আমরা মাঠে অনেক ভালো কিছু করেছি, আবার কিছু ভুলও করেছি যা দ্রুত শুধরে নিতে হবে। এ সময় নিজের দলের ভুলত্রুটি নিয়ে কড়া সমালোচনা করে মেসি বলেন, আজ আমাদের লাইনে অনেক সমস্যা ছিল, আমরা প্রতিপক্ষকে ঠিকমতো প্রেসিং করতে পারিনি। দলের রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠের মধ্যে দূরত্ব অনেক বেশি ছিল, যার ফলে খেলোয়াড়দের মধ্যে সমন্বয়ও কিছুটা কম দেখা গেছে।
আর্জেন্টাইন অধিনায়ক প্রতিপক্ষের শারীরিক ফুটবল ও গতির প্রশংসা করে বলেন, ওরা মাঠের ভেতরে যেভাবে প্রচণ্ড শারীরিক শক্তি ও তীব্রতা নিয়ে খেলেছে, সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে আমাদের বেশ কষ্ট হয়েছে। তবে সমস্ত বাধা ও কেপ ভার্দের কঠিন প্রতিরোধ পেরিয়ে আর্জেন্টিনা এখন শেষ ষোলোর মঞ্চে আফ্রিকার আরেক পরাশক্তি মিশরের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। আগামী মঙ্গলবার, ৭ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার এই মহালড়াইয়ে মোহামেদ সালাহ ও ওমর মারমুশদের মিশরের বিপক্ষে মাঠে নামবেন লিওনেল মেসি ও রদ্রিগো ডি পলরা।
আকাশজমিন / আরআর