জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বিরূপ প্রভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা এখন মানবজাতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সদ্য বিদায়ী জুন মাসের ১৫ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত ইউরোপ মহাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে এক নজিরবিহীন ও প্রলয়ংকরী তীব্র তাপপ্রবাহ। এই নির্দিষ্ট সময়ে ইউরোপের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি এলাকার মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তীব্র ও অসহনীয় তাপমাত্রার মুখোমুখি হয়েছেন। দীর্ঘ বিশ বছরেরও বেশি সময় আগে মহাদেশটিতে যে ঐতিহাসিক ও রেকর্ড গড়া তাপপ্রবাহ দেখা গিয়েছিল, তার চেয়েও এবারের পরিস্থিতি আরও বেশি ভয়াবহ। তবে পরিবেশবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এত বড় বিপর্যয়ের পরেও চরম গরম ও তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় ইউরোপ মহাদেশটি এখনও পর্যাপ্ত ও কাঠামোগতভাবে প্রস্তুত নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ের এই ভয়াবহ তাপপ্রবাহে পুরো ইউরোপ জুড়ে প্রায় ৪১ কোটি মানুষের বসবাসকারী অঞ্চল সরাসরি আক্রান্ত হয়েছে। এর বিপরীতে, গত ২০০৩ সালের ১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপে যে স্মরণকালের রেকর্ড তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছিল, সেই সময় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩২ কোটি। এএফপি মূলত ইউরোপীয় খরা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের দৈনিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রার গ্রাফ এবং ইউরোপীয় কমিশনের জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টারের জনসংখ্যার হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এই গাণিতিক হিসাবটি তৈরি করেছে। চলতি বছরের এই তীব্র গরম ও দাবদাহের কারণে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে অতিরিক্ত কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আশঙ্কাজনকভাবে মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ায় দেশগুলোর স্বাস্থ্যখাতে জরুরি অবস্থা তৈরি হয়। তীব্র গরমের হাত থেকে শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে বহু অঞ্চলের স্কুল-কলেজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পূর্বনির্ধারিত বড় বড় সংগীত উৎসব বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকেরা। একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র বা এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের প্রসার ঘটানো উচিত কি না, তা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক ও পরিবেশগত সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
জুনের এই নজিরবিহীন তাপপ্রবাহে ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডের প্রায় পুরো জনসংখ্যা এবং স্পেন ও ইতালির মোট জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশের চেয়েও বেশি মানুষ অন্তত একবার হলেও ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তীব্র তাপদাহের মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। ভৌগোলিক দিক থেকে এই তাপপ্রবাহটি প্রথমে আইবেরীয় উপদ্বীপ থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে ইউক্রেন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। যার প্রভাবে পুরো বলকান অঞ্চল ও জার্মানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিবেদনটির চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্পেনের ঐতিহাসিক লেইদা শহর ও কাতালোনিয়া অঞ্চলের আশপাশের এলাকাগুলোতে টানা অন্তত ১৬ দিন ধরে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে অবস্থান করছিল। এছাড়া, পুরো ইউরোপ মহাদেশ জুড়ে প্রায় ৫ কোটি মানুষের বসবাসকারী এলাকায় এই ভয়াবহ তাপপ্রবাহ চলাকালীন অন্তত ১০ দিন দৈনিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে এক নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে।
আঞ্চলিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তীব্র এই তাপদাহের কবলে পড়ে মধ্য ও দক্ষিণ ফ্রান্সে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম স্পেনে ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি এবং উত্তর ইতালির প্রধানত পো উপত্যকা অঞ্চলে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ সাধারণ মানুষ চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হন। তবে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এ ধরনের তীব্র তাপমাত্রা তুলনামূলক কম সময় স্থায়ী হয়েছিল। যেমন পোল্যান্ডে সর্বোচ্চ তিন দিন এবং ইউক্রেনে সর্বোচ্চ চার দিন ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। কিন্তু তাপমাত্রা কম সময় স্থায়ী হলেও জার্মানি, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র ও হাঙ্গেরিতে সর্বকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ডে জুন মাসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন নজিরবিহীন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। এমনকি ফ্রান্সে এই সময়ের গড় তাপমাত্রাও অতীতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার ফলে দেশটিতে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ ও দমবন্ধ করা রাতের নতুন রেকর্ড নথিভুক্ত হয়েছে।
আকাশজমিন / আরআর