আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রশান্ত মহাসাগরে জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব ‘এল নিনো’ আরও শক্তিশালী রূপ ধারণ করায় বিশ্বজুড়ে চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে আগামী মাসগুলোতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ, তীব্র খরা, অতিবৃষ্টি ও প্রলয়ংকরী বন্যার মতো মারাত্মক দুর্যোগ দেখা দিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত জাতিসংঘের বৈশ্বিক জলবায়ু বিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে এল নিনো অত্যন্ত দ্রুত ও বিপজ্জনকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু মডেলের চুলচেরা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে, যা জলবায়ুর স্বাভাবিক ভারসাম্যকে পুরোপুরি ভেঙে দেবে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মুখপাত্র ক্লেয়ার নালিস জানান, বছরের সবচেয়ে উত্তপ্ত মৌসুমের শুরুতেই ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে ইতিমধ্যেই রেকর্ড ভাঙা গরম দেখা দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গত সপ্তাহে জার্মানিতে ৪১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা দেশটির আবহাওয়া ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে চলমান এই তীব্র তাপপ্রবাহ আরও বেশ কিছুদিন স্থায়ী হতে পারে। এর পাশাপাশি মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চলসহ উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে কম বৃষ্টিপাত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা তীব্র খরার জন্ম দিতে পারে।
অন্য দিকে, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি বড় অংশে আগামী দিনগুলোতে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তবে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে পূর্ব আফ্রিকায় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে, যা সেখানে ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি তৈরি করবে। এই ক্ষেত্রে ‘ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল’ নামক ভারত মহাসাগরীয় আরেকটি জলবায়ুগত উপাদানও নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এল নিনোর এই চরম সতর্কবার্তা আসার পরপরই বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকারকে আগাম প্রস্তুতি নিতে নজিরবিহীন উদ্যোগের আহ্বান জানানো হয়েছে। জীবন ও জীবিকা রক্ষার জন্য এখনই সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার সময়, তবে সেই সুযোগ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উইলফ্রান মুফুম্বা সিলভা জোর দিয়ে বলেছেন, যেসব অঞ্চলে খরার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অন্যান্য জরুরি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট খাতে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিশ্বনেতাদের এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সহজ কথায়, এল নিনো হলো এমন একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত চক্র, যেখানে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং এটি একটানা ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। সাধারণত মার্চ থেকে জুনের মধ্যে এটি তৈরি হতে শুরু করে এবং নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছায়। জাতিসংঘের মতে, এল নিনোর এই তীব্রতার সঙ্গে যখন মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি আরও বেশি ভয়াবহ রূপ নেয়।
আকাশজমিন / আরআর