প্রকাশিত এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অভিবাসী আগমনের এই হার কেবল গত বছরের চেয়েই কম নয়, বরং তা ২০২৪ সালের প্রথমার্ধের তুলনায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে ১৩ হাজার ৪৮৯ জন অনিয়মিত অভিবাসী ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছিলেন, যার অর্থ দাঁড়ায় এবার সেই সংখ্যার চেয়েও ১২ শতাংশ কম আগমন রেকর্ড করা হয়েছে। অভিবাসনের এই নিম্নমুখী গ্রাফ দেশটির বর্তমান ক্ষমতাসীন দল লেবার পার্টির জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক এবং ইতিবাচক একটি খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, বেশ কয়েক মাস ধরেই জাতীয় জনমত জরিপে তারা নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন কট্টর অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক দল রিফর্ম ইউকের চেয়ে বেশ খানিকটা পিছিয়ে রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই মানবপাচারকারী শক্তিশালী চক্রগুলোকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার জোরালো অঙ্গীকার করেছিলেন। যদিও তার প্রশাসন দায়িত্ব পালন করার সময় ২০২৫ সালে ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে অনিয়মিত অভিবাসীদের আসার সংখ্যা ২০১৮ সালের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ডে পৌঁছেছিল। উল্লেখ্য, ২০১৮ সাল থেকেই এই বিপজ্জনক জলপথ ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে ঢোকার প্রবণতা মারাত্মকভাবে বাড়তে শুরু করে। এদিকে, গত দশ দিন আগে কিয়ার স্টারমার আকস্মিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে খুব শিগগিরই লেবার পার্টির নতুন নেতা এবং গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক সফল মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন বলে জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
অভিবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধান ও আশ্রয় ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে গত ৩০ জুন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একটি নতুন কঠোর বিল উত্থাপন করেছে দেশটির সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের পেশ করা এই নতুন আইনি প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো অনিয়মিত অভিবাসনকে সম্পূর্ণ নিরুৎসাহিত করা এবং যেসব বিদেশি অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন, তাদের অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াকে আইনিভাবে আরও জোরদার করা। প্রস্তাবিত এই নতুন আইনে শরণার্থীদের দেওয়া স্থায়ী মর্যাদার নীতি বাতিল করে তা সাময়িক বা অস্থায়ী করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনের প্রয়োগ সীমিত করা এবং আধুনিক দাসত্ববিষয়ক আইন সংশোধনেরও প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যার ফলে আবেদন বাতিল হওয়া আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি আপিল করার সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসবে।
এই অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচার পুরোপুরি রুখতে যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে জার্মানি এবং ইরাকের মতো বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পন্ন করেছে। চুক্তির শর্তানুযায়ী, জার্মানি তাদের দেশে মানবপাচারকারীদের ব্যবহৃত নৌকার যন্ত্রাংশ মজুত রাখার গোপন গুদামগুলোতে কঠোর নজরদারি ও অভিযান চালাতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া ইরাকের সাথে অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে। অন্যদিকে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ফ্রান্সের সঙ্গে তিন বছর মেয়াদী একটি বড় চুক্তি সই করেছে যুক্তরাজ্য। এই চুক্তির আওতায় যেসব ফরাসি সৈকত থেকে ছোট নৌকাগুলো ব্রিটিশ উপকূলে রওনা দেয়, সেখানে টহল ব্যবস্থা জোরদার করতে ফ্রান্সকে ৬৬ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড (যা প্রায় ৭৭ কোটি ১০ লাখ ইউরো) আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে ব্রিটিশ সরকার।