ক্রীড়া প্রতিবেদক
২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব মানেই ব্রাজিলের জন্য এক নির্মম ইউরোপীয় ট্র্যাজেডি। দুই দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও সেই তিক্ত ও বেদনাবিধুর অভিজ্ঞতার কোনো ব্যতিক্রম ঘটল না ২০২৬ সালের বিশ্বমঞ্চেও। ম্যাচের শুরুতে পাওয়া পেনাল্টি ভাগ্য হাতছাড়া করা কিংবা দ্বিতীয়ার্ধে এন্দ্রিক-মার্তিনেল্লিদের একের পর এক সহজ সুযোগ নষ্টের মাশুল দিতে হলো পুরো দলকে। ভাগ্যটাও যেন আজ পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল লাতিন আমেরিকার এই পরাশক্তির ওপর থেকে। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর হাইভোল্টেজ ও বাঁচা-মরার লড়াইয়ে নরওয়ের কাছে হেরে অশ্রুসিক্ত চোখে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল।
নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে সোমবারের এই মহাকাব্যিক ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২–১ ব্যবধানে হেরেছে ব্রাজিল। জোড়া গোল করে নরওয়েকে কোয়ার্টার ফাইনালের ঐতিহাসিক টিকিট এনে দেওয়ার মূল নায়ক ফুটবল বিশ্বের নতুন গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড। আর ব্রাজিলের হয়ে পেনাল্টি থেকে একমাত্র সান্ত্বনার গোলটি করেছেন প্রাণভোমরা নেইমার জুনিয়র। ম্যাচের শুরু থেকেই অবশ্য প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক ও গোছানো ফুটবল খেলতে থাকে নরওয়ে। খেলার মাত্র ৩ মিনিটের মাথায় প্যাট্রিক বার্গ বল ব্রাজিলের জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে রেফারি তা বাতিল করে দেন। তবে এই ধাক্কায় দমে না গিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রেখে মার্টিন ওডেগার্ড, আলেক্সান্ডার সরলথ ও আর্লিং হলান্ডকে কেন্দ্র করে একের পর এক বিষাক্ত আক্রমণ গড়ে তোলে ইউরোপের এই উদীয়মান দলটি।
শুরুর সেই ভয়াবহ চাপ কাটিয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের চিরচেনা ছন্দে ফিরতে শুরু করে ব্রাজিল। ম্যাচের ১৩তম মিনিটে ম্যাথেউস কুনিয়াকে বক্সের ভেতরে নরওয়ের ডিফেন্ডাররা ফাউল করলে ভিএআর (VAR) পর্যালোচনার পর পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। কিন্তু কোটি ব্রাজিল ভক্তকে স্তব্ধ করে দিয়ে ব্রুনো গিমারায়েসের নেওয়া দুর্বল স্পটকিক দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন নরওয়েজিয়ান গোলরক্ষক ওরইয়ান নিল্যান্ড। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৮৬ সালের পর বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কোনো খেলোয়াড়ের এটাই প্রথম পেনাল্টি মিসের রেকর্ড।
বিরতির আগে দুদলই একাধিক গোলের সুযোগ তৈরি করে। ৩১ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির এক নিচু ক্রস নিল্যান্ডের পায়ে লেগে অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে চলে যায়। ৪১ মিনিটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের নেওয়া এক জোরালো শটও রুখে দেন নরওয়ের এই গোলরক্ষক। অন্যদিকে যোগ করা সময়ে মার্টিন ওডেগার্ডের এক বুলেট গতির শট ঠেকিয়ে ব্রাজিলকে নিশ্চিত গোলের হাত থেকে রক্ষা করেন অ্যালিসন বেকার। ফলে গোলশূন্য সমতায় শেষ হয় প্রথমার্ধ।
বিরতির পর ব্রাজিল আক্রমণের ধার আরও বাড়ায়। ৬০ মিনিটে কার্লো আনচেলত্তির তুরুপের তাস হিসেবে বদলি নেমেই নরওয়ের গোলকিপারকে একা পেয়েও এক সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন তরুণ স্ট্রাইকার এন্দ্রিক। এরপর রায়ানের দূরপাল্লার এক বাঁকানো শটসহ ব্রাজিলের আরও কয়েকটি চমৎকার প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেন অপ্রতিরোধ্য নিল্যান্ড। ম্যাচের ৬৮ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির বদলে ইনজুরি কাটিয়ে মাঠে নামানো হয় নেইমারকে। তবে ম্যাচের আসল মোড় ঘুরিয়ে দেন নরওয়ের বদলি খেলোয়াড় আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ। ৭৯ মিনিটে তাঁর এক জাদুকরী ক্রস থেকে আর্লিং হলান্ডের শক্তিশালী ও উড়ন্ত হেডে লিড নেয় নরওয়ে। গোল হজমের পর ব্রাজিল অলআউট আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়লেও সমতা ফেরাতে পারেনি। উল্টো ৯০ মিনিটে আবারও সেই শেলদেরুপের নিখুঁত পাস থেকে ডি-বক্সের বাইরে থেকে এক চোখধাঁধানো শটে নিজের ও দলের দ্বিতীয় গোলটি করেন হলান্ড। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে ১০০তম মিনিটে ক্যাসেমিরোকে ফাউলের ঘটনায় পেনাল্টি পেলে সেখান থেকে নেইমার গোল করে ব্যবধান ২–১ করলেও, তা কেবল পরাজয়ের ব্যবধানই কমিয়েছে, ব্রাজিলের ট্র্যাজেডি আটকাতে পারেনি।
আকাশজমিন/ আরআর