ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান ডিএমপির ৩ সহকারী পুলিশ কমিশনারকে নতুন পদে বদলি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১০৭ ডলার হরমুজে নতুন নৌপথ: ওমানের আঞ্চলিক বৈঠক স্থগিত দেশে ফিরে ইতালিতে হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুললেন অভিনেত্রী বাঁধন ব্রিকসে বিশ্বনেতাদের দেওয়া হলো নিরামিষ খাবার: বিজেপি-কংগ্রেস তুমুল বিতর্ক সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বর: ডেঙ্গু ও হামের সঙ্গে বাড়ছে টাইফয়েড ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই কি থামবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ? ‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে

রোনালদোর সেই বিতর্কিত নিয়মের ফাঁদেই বাঁচল যুক্তরাষ্ট্র!


  • আপলোড সময় : সোমবার ০৬ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৫:৫৭ পিএম

স্পোর্টস ডেস্ক

 বেলজিয়ামের বিপক্ষে ফিফা বিশ্বকাপের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শেষ ষোলোর নকআউট পর্বের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের ঠিক আগে এক বিশাল এবং অভাবনীয় স্বস্তি পাচ্ছে বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। রাউন্ড অব থার্টি টু তথা শেষ বত্রিশের ম্যাচে শক্তিশালী বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সরাসরি লাল কার্ড দেখা আমেরিকার প্রধান তারকা স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের এক ম্যাচের বাধ্যতামূলক ও স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত আকস্মিক ও নাটকীয়ভাবে স্থগিত করেছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এবং খোদ ফিফার নিজস্ব কঠোর নিয়মকানুনের দীর্ঘ ইতিহাসে এই ধরনের আকস্মিক ও অভূতপূর্ব সিদ্ধান্তে পুরো ফুটবল বিশ্ব একপ্রকার স্তব্ধ ও হতভম্ব হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল বোদ্ধা, বিশ্লেষক ও সমালোচকদের অনেকের কাছেই ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে নেওয়া এই রহস্যময় সিদ্ধান্তকে একপ্রকার ‘তামাশার’ মতো মনে হচ্ছে, যা খেলাটির দীর্ঘদিনের সুপ্রতিষ্ঠিত নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

তবে বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠলেও এই বিতর্কিত ও আকস্মিক সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত উষ্ণভাবে স্বাগত জানিয়েছেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সর্বোচ্চ নেতা নিজের ব্যক্তিগত ও বহুল আলোচিত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বিশেষ পোস্টে ফিফার এই পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ট্রাম্প তাঁর সেই পোস্টে লিখেছেন, ‘সঠিক কাজটি করার জন্য এবং একটি বড় অবিচারকে বদলে দেওয়ার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ!’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই প্রকাশ্য ও সরাসরি বার্তার পর পুরো ঘটনার আড়ালের গল্প জানার জন্য বিশ্ব ক্রীড়ামাধ্যমগুলো নড়েচড়ে বসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইনফর্ম স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের এক ম্যাচের এই বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করার জন্য খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বয়ং ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোকে ব্যক্তিগতভাবে সরাসরি ফোন করেছিলেন বলে ব্রিটিশ প্রভাবশালী গণমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক চাঞ্চল্যকর ও এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। হোয়াইট হাউসের ভেতরে ঘটে যাওয়া এই নজিরবিহীন খবরটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে আসার পর পুরো ফুটবলবিশ্বে তোলপাড় ও তীব্র শোরগোল পড়ে গেছে। ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের একাধিক অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও উচ্চপদস্থ সূত্র ডেইলি মেইলকে শতভাগ নিশ্চিত করেছে যে, বালোগানের ওপর থাকা কড়া নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার মতো ফিফার এই বিস্ময়কর ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ঠিক পূর্বমুহূর্তে ট্রাম্প নিজেই ইনফ্যান্তিনোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের এক ‘অভূতপূর্ব’ ও বিস্ময়কর পদক্ষেপটি গ্রহণ করেন।

হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মতে, এই নাটকীয় সিদ্ধান্ত ঘোষণার কিছু মুহূর্ত পরেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফিফাকে বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন দায়িত্বরত প্রেসিডেন্টের ফুটবল মাঠের একটি সাধারণ লাল কার্ডের মতো টেকনিক্যাল বিষয়ে এমন সরাসরি ও প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ পুরো টুর্নামেন্টের ফেয়ার প্লে বা সততার নীতিকে ‘সম্পূর্ণ তামাশায়’ পরিণত করেছে বলে বিশ্ব ফুটবলের অসংখ্য সাবেক খেলোয়াড় ও বিশ্লেষক তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্তব্য করছেন। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনার পর থেকে বিশ্বজুড়ে ফিফা ও হোয়াইট হাউসের এই গোপন আঁতাতের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা, ধিক্কার ও কড়া সমালোচনা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে মার্কিন গণমাধ্যমের কিছু চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে, মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লাটনিক এবং হোয়াইট হাউসের প্রভাবশালী টাস্কফোর্স প্রধান অ্যান্ড্রু গিউলিয়ানি মিলে বালোগানের এই বিতর্কিত বহিষ্কারাদেশকে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করার জন্য অত্যন্ত দ্রুততার সাথে একটি শক্তিশালী ও দক্ষ আইনি দল গঠন করেছিলেন, যারা ব্যাকস্টেজে দিনরাত কাজ করেছে।

ফিফার এমন অভাবনীয় ও চরম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত স্বভাবতই বেলজিয়াম ফুটবল শিবিরে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও চরম অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আরবিএফএ) তাদের একটি অত্যন্ত কঠোর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পরিষ্কার ভাষায় জানায় যে, তারা ফিফার এই পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তে পুরোপুরি ‘স্তম্ভিত’ ও নির্বাক হয়ে গেছে এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের ‘ফেয়ার প্লে বা সততার মূল নীতি রক্ষার্থে’ তারা আইনিসহ সব ধরনের সম্ভাব্য পথ খতিয়ে দেখছে। দলটির হেড কোচ রুডি গার্সিয়া সংবাদ সম্মেলনে নিজের ভেতরের তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি আসলে জানতাম না যে চলতি বিশ্বকাপে ৫ জুলাইয়ের এই দিনটি এখন ১ এপ্রিলে রূপ নিয়েছে—অর্থাৎ এটি আসলে এপ্রিল ফুল বা বিশ্বকে বোকা বানানোর দিন হয়ে গেছে। আমরা কেবল একটি ম্যাচ জেতার জন্য নয়, বরং ফুটবল খেলাটির দীর্ঘদিনের চেতনা এবং এর আন্তর্জাতিক নৈতিকতা রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করছি।’

অন্যদিকে বেলজিক দলের তারকা গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছেন যে, এই সিদ্ধান্তটি তাদের পুরো দলের জন্য একটি চরম ‘বিস্ময়’ হিসেবে এসেছে। তিনি আক্ষেপের সুরে আরও যোগ করেন, ‘ফিফার এই বিশেষ সিদ্ধান্তটি যদি ম্যাচের আরও অনেক আগে নেওয়া হতো, তবে হয়তো আমরা কৌশলগতভাবে আরও অনেক ভালো ও নিখুঁত প্রস্তুতি নিতে পারতাম। তবে খেলোয়াড় হিসেবে মাঠের লড়াইয়ে আমাদের জন্য কিছুই আসলে বদলায়নি, আমরা শতভাগ জেতার দিকেই আমাদের পুরো মনোযোগ ধরে রাখছি।’ বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাদের আপত্তিতে আরও জোর দিয়ে বলেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নেওয়া এই বিশেষ পদক্ষেপটি ফিফার নিজস্ব টুর্নামেন্ট বিধিমালার শতভাগ পরিপন্থী এবং বেআইনি। কারণ সরাসরি লাল কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে পরবর্তী ম্যাচটিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ও বাধ্যতামূলকভাবে ফুটবলার নিষিদ্ধ থাকার যে বিশ্বজনীন নিয়ম রয়েছে, তা গত মে মাসে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী সবকটি দলের কাছে পাঠানো ফিফা বিশ্বকাপের অফিসিয়াল সার্কুলারেও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছিল। এই চরম সংবেদনশীল ও বিতর্কিত বিষয়ে বিশ্ব ফুটবলের গভর্নিং বডি ফিফা আপাতত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে ফুটবল সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন নোবেল শান্তি पुरस्कार পেতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তখন ফিফা তড়িঘড়ি করে সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে একটি নতুন ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ (ফিফা শান্তি পুরস্কার) তৈরি করে তা ট্রাম্পের হাতে তুলে দিয়ে এক অভিনব সখ্যতার প্রমাণ দিয়েছিল।


ডোনাল্ড ট্রাম্প যে পর্দার আড়ালে থেকে ব্যক্তিগতভাবে এই বিষয়ে জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোকে ফোন করে লাল কার্ডের সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করার জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, সেই খবর মূল ধারার সংবাদমাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগেই ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সেই রহস্যময় পোস্টটি বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের মাঝে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার ডালপালা মেলে দেয়। সেই জল্পনার লেলিহান আগুনে আরও বড় আকারে ঘি ঢালেন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দুনিয়ার পরিচিত মুখ এবং ‘বারস্টুল স্পোর্টস’-এর প্রধান ডেভ পোর্টনয়।

ফিফার পক্ষ থেকে বালোগানের কার্ড বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই পোর্টনয় তাঁর নিজস্ব ভেরিফাইড এক্সে (সাবেক টুইটার) অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে লিখেছিলেন, ‘ডেভি পিচের ফুটবল সূত্রগুলো পরিষ্কার বলছে যে খুব শিগগিরই একটি লাল কার্ড সম্পূর্ণ বাতিল হতে যাচ্ছে।’ এরপর ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়ে যখন সত্যি সত্যি বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের অফিসিয়াল খবরটি সামনে আসে, তখনই পোর্টনয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের একটি সুনিপুণ এডিটেড ছবি (যেখানে দুজনের মাথাতেই আমেরিকার ‘ইউএস সকার’-এর ক্যাপ লোগো যুক্ত ছিল) পোস্ট করে আকারে-ইঙ্গিতে পরিষ্কার বুঝিয়ে দেন যে ট্রাম্প আসলেই এই বিশাল কান্ডটির পেছনে মূল কারিগর হিসেবে ছিলেন। তিনি তাঁর সেই পোস্টে বেশ কৌতুকপূর্ণভাবে লেখেন, ‘অনেকেই এখন আমাকে অনবরত জিজ্ঞেস করছেন কীভাবে ফুটবলের এই ঐতিহাসিক লাল কার্ড বাতিল হলো? পর্দার আড়ালে আসলে কী ঘটেছিল? কে এই অসম্ভব কাজটি করালো? কোন অকাট্য সূত্রের ভিত্তিতে আমি আমার পুরো ক্যারিয়ারের সম্মান বাজি রেখে এই ডেভি পিচ বোমা ফাটিয়েছিলাম? তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, একজন মহান ও পেশাদার সাংবাদিক কখনোই নিজের ভেতরের মূল সূত্র প্রকাশ করেন না। তাই আমি অত্যন্ত দুঃখিত।’

ভেতরের খবর থেকে জানা গেছে, মার্কিন ফুটবল ফেডারেশনের শক্তিশালী আইনি দল ফিফার জুডিশিয়াল কমিটির কাছে অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে একটি বিশদ আপিল আবেদন জমা দিয়েছিল, যেখানে তাদের মূল আইনি যুক্তি ছিল যে বালোগানকে মাঠের মধ্যে সরাসরি লাল কার্ড দেখানোর আগে দায়িত্বরত রেফারিরা মূলত ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) এর স্লো-মোশন রিপ্লের ভুল ব্যবহার করেছিলেন এবং সেই ভুল কোণ থেকে পরিস্থিতি বিচার করেছিলেন। ফিফার এই নাটকীয় ও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় ফুটবল দল তাদের এক সংক্ষিপ্ত আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘আমরা ফিফার ডিসিপ্লিনারি ও শৃঙ্খলা কমিটির এই বিশেষ সিদ্ধান্তকে সাদরে মেনে নিচ্ছি এবং ফোলারিন বালোগান আমাদের আগামী গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচটিতে খেলার সম্পূর্ণ যোগ্য হওয়ায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।

আমাদের পুরো দলের মনোযোগ এখন সম্পূর্ণভাবে বেলজিয়াম ম্যাচের রণকৌশল সাজানোর দিকে।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনো অবশ্য গণমাধ্যমের সামনে অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন যে, বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এই পর্দার আড়ালের আইনি বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বা টেকনিক্যাল টিম মোটেও জড়িত ছিলেন না। ম্যাচ পূর্ববর্তী অফিশিয়াল সংবাদ সম্মেলনে পচেত্তিনো বলেন, ‘আমাদের দেশের ফুটবল ফেডারেশন পর্দার আড়ালে কঠোর পরিশ্রম করছিল। আমাদের ফেডারেশনের প্রধান নির্বাহী জেটি ব্যাডসন এবং পুরো ফুটবল ফেডারেশন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে আমাদের দলের এই আইনি পরিস্থিতিটি দেখভাল করছিল। আমি নিজে এই অফ-ফিল্ড প্রক্রিয়ায় মোটেও জড়িত ছিলাম না এবং আমি মাঠের ভেতর বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে শক্তিশালী দল প্রস্তুত করার কাজে চরম ব্যস্ত ছিলাম।’ তবে স্বাগতিক দলের প্রধান কোচ হিসেবে এমন অভাবনীয় সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্য সাধুবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘ফুটবল খেলার সামগ্রিক স্বার্থের জন্যই এটি অত্যন্ত ভালো একটি সিদ্ধান্ত যে, মাঠের ভেতরের আদি বাস্তবতার বাইরে গিয়ে কেবল স্লো-মোশনের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া একটি ভুল ও কঠোর সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবর্তন করা গেছে।’

এদিকে আরও জানা গেছে যে, গত রোববার সকাল নাগাদ স্বাগতিক মার্কিন ফুটবল দলকে ফিফার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলেও দলের মূল খেলোয়াড়রা তাৎক্ষণিকভাবে তা মোটেও জানতে পারেননি, বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্ক্রল ও ইন্টারনেটের বরাতেই দলের অনেকে এই চমকপ্রদ বিষয়টি প্রথম জানতে পেরেছেন। মার্কিন দলের অন্যতম তারকা ডিফেন্ডার ক্রিস রিচার্ডস এই বিষয়ে নিজের বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘ফেসবুক-টুইটারে প্রথম যখন খবরটি দেখি, তখন আমরা কেউই নিশ্চিত ছিলাম না যে এটি আসলেই সত্যি কি না। কারণ আজকাল এই আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এর যুগে ইন্টারনেটে অনেক ভুয়া খবর ও প্রশ্ন থাকে। তবে শেষ পর্যন্ত আমরা অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকেই বিষয়টি জানতে পারি এবং এর সত্যতা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার পর আমাদের পুরো দলের ভেতরে দারুণ এক আনন্দের জোয়ার বয়ে গেছে।’ অন্যদিকে লাল কার্ডের সেই মূল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা

প্রসঙ্গে বালোগান নিজে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ‘প্রথমত, মাঠের সেই ফাউলটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ও একটি সাধারণ মিস-টাইমড ট্যাকল ছিল। রেফারি মাঠে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়, তবে শান্ত মাথায় চিন্তা করলে আমার মনে হয় না এটি কোনোভাবেই সরাসরি লাল কার্ড দেওয়ার মতো অপরাধ ছিল। ঘটনাটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত হওয়ার কারণে বড়জোর একটি হলুদ কার্ড দেওয়াটাই মাঠে সবচেয়ে ন্যায্য ও যৌক্তিক হতো।’ অন্যদিকে মার্কিন দলের অন্যতম প্রাণভ্রমরা ও অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিক বলেন, ‘আমরা যখন বাসে করে মাঠের দিকে আসছিলাম, ঠিক তখনই বাসের মধ্যে এটা প্রথম জানতে পারি। প্রথমে শুনে আমাদের নিজেদেরই মনে হয়েছিল—আরে এটা কি আসলেই সত্যি হতে পারে? এরপর যখন জানলাম খবরটি শতভাগ সত্য, তখন মনে হলো এটা আমাদের দেশের ফুটবলের জন্য একটি অসাধারণ ও দারুণ সুখবর।’

ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, ফিফার অফিশিয়াল টুর্নামেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী সরাসরি লাল কার্ডের শাস্তি হিসেবে পরবর্তী এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক ফুটবলে সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক এবং পূর্বে ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তারাও একাধিকবার প্রেস কনফারেন্সে নিশ্চিত করেছিলেন যে, সরাসরি লাল কার্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো দেশের ফুটবল ফেডারেশনের আপিল করার কোনো আইনি সুযোগই নেই। তবে ফিফার জুডিশিয়াল কমিটি এবার তাদের কঠোর আইনের বইয়ের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ২৭ নম্বর ধারার একটি অত্যন্ত বিরল ও সূক্ষ্ম ফাঁকফোকর ব্যবহার করে স্বাগতিক দেশের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা এড়াতে অলৌকিকভাবে সক্ষম হয়েছে। ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি তাদের শৃঙ্খলা বিধির এই বিশেষ ২৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করেছে। ফুটবলের এই সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, বালোগানের ওপর থাকা এক ম্যাচের এই নিষেধাজ্ঞা আগামী এক বছরের জন্য সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে। তবে এই সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক ম্যাচে তিনি যদি পুনরায় একই ধরনের কোনো গুরুতর ফাউল বা ফিফার শৃঙ্খলা নিয়মভঙ্গ না করেন, তবে এই স্থগিত থাকা নিষেধাজ্ঞাটি চিরতরে বাতিল হয়ে যাবে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি ও পর্তুগালের মহান অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ক্ষেত্রেও অতীতে ফিফা ঠিক এই একই পরীক্ষামূলক ও বিতর্কিত নিয়মটির প্রথম সফল প্রয়োগ করেছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে কনুই দিয়ে আঘাত করার অপরাধে রোনালদোকে মাঠের মধ্যে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল। এরপর আর্মেনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে এক ম্যাচের বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কাটানোর পর, ফিফা বিশেষ হস্তক্ষেপ করে তাঁর ওপর থাকা বাকি আরও দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত করে দিয়েছিল, যার প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ তিনি চলতি বিশ্বকাপে শুরু থেকেই পর্তুগাল দলকে মাঠে নেতৃত্ব দিতে পারছেন।

বালোগানের এই লাল কার্ডের ঘটনাটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে এত তীব্র বিতর্ক ও আলোড়নের মূল কারণ হলো, গত পহেলা জুলাই শেষ বত্রিশের বাঁচা-মরার লড়াইয়ের ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধে দুর্দান্ত ও দর্শনীয় এক গোল করে স্বাগতিক দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নিয়েছিলেন ফোলারিন বালোগান। এরপর মাঠের মূল নাটকীয় ও বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটে ম্যাচের ঠিক ৬১তম মিনিটের মাথায়। মাঠের মাঝখানে বল নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য তীব্র গতিতে ছুটে যান বসনিয়ার রক্ষণভাগের খেলোয়াড় মুহারেমোভিচ ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার বালোগান। বল নিজের পায়ে নিয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন মুহারেমোভিচ। ঠিক ওই সময় পেছন থেকে বসনিয়ার সেই ফুটবলারের ডান পায়ে বেশ কড়াভাবে ট্যাকল করে বসেন বালোগান। মাঠের রেফারি তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভাব্য সরাসরি লাল কার্ডের অপরাধ পরীক্ষা করার জন্য সরাসরি ভিএআরের (VAR) শরণাপন্ন হন।

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে রিপ্লে দেখার পর ম্যাচের ৬৪তম মিনিটে রেফারি পকেট থেকে সরাসরি লাল কার্ড বের করে দেখালে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন বালোগান। চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত দুর্দান্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গোল করে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র দলকে মাঠের সামনে থেকে একাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই ফরোয়ার্ড। তাই দলের অন্যতম সেরা ও প্রধান গোলমেশিন অস্ত্রকে হারিয়ে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তীব্র ক্ষোভ ও চরম প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন মার্কিন কোচ মরিসিও পচেত্তিনো। তবে ফিফার সুনির্দিষ্ট ও কঠোর আইনের কারণে প্রাথমিকভাবে এই অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক আপিল করার কোনো সুযোগই খোলা ছিল না যুক্তরাষ্ট্রের সামনে। কারণ ফিফার মূল সংবিধির ৬৬.৪ ধারা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ম্যাচে সরাসরি লাল কার্ড দেখলে পরবর্তী ম্যাচে নিষেধাজ্ঞা থাকা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। যদিও শেষমেশ মার্কিন প্রেসিডেন্টের এক প্রভাবশালী জাদুকরী ফোন কলের জোড়ে নিজেদের সেই অলঙ্ঘনীয় আইন থেকে অবিশ্বাস্যভাবে পিছু হঠতে বাধ্য হলো ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর