ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
কাশফুল শুধু সৌন্দর্য নয়, অনেকের জীবিকাও বটে তাড়াশে গোয়ালঘরের তালা ভেঙে ৮টি গরু চুরি, নিঃস্ব কৃষক পরিবার ডেঙ্গুতে আরও ৮ জনের মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৭৩৩ জন ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াতের অনানুষ্ঠানিক মেয়র প্রার্থী ঘোষণা চারবার গুলিবিদ্ধ ও তিনবার কারাবরণ: ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আলোচনায় ইশরাক অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান ডিএমপির ৩ সহকারী পুলিশ কমিশনারকে নতুন পদে বদলি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১০৭ ডলার হরমুজে নতুন নৌপথ: ওমানের আঞ্চলিক বৈঠক স্থগিত দেশে ফিরে ইতালিতে হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুললেন অভিনেত্রী বাঁধন

আধুনিকতার ফাঁকে দাঁড়িয়ে এক বিভ্রান্ত সমাজ: একটি গভীর সামাজিক পাঠ


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ০৭ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৭:৪৬ পিএম

মহিবুল ইসলাম:

বাংলাদেশের সমাজ আজ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় আমরা দ্রুত বদলে যাচ্ছি। স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, কর্পোরেট জীবন, নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ, ব্যক্তিস্বাধীনতার ভাষা  সবকিছুতেই আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সমাজের মনস্তত্ত্ব, নৈতিকতা আর পারিবারিক মূল্যবোধ সেই গতিতে এগোয়নি। ফলে তৈরি হয়েছে এক গভীর ফাটল  যেখানে মানুষ একই সঙ্গে আধুনিক জীবনযাপন করতে চায়, আবার পুরনো নৈতিক কাঠামোর ভেতরেও বন্দি থাকে। এই দ্বৈততার মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে সন্দেহ, দাম্পত্য কলহ, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, পারিবারিক সহিংসতা, এমনকি আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনা।

সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম অগবার্ন এই পরিস্থিতির একটি সঠিক নাম দিয়েছিলেন  (Cultural Lag) বা সাংস্কৃতিক ব্যবধান। তাঁর মতে, প্রযুক্তি ও অর্থনীতি যে গতিতে বদলায়, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সে গতিতে বদলায় না। দুইয়ের মাঝে তৈরি হয় একটি সময়গত ফাঁক। আজকের বাংলাদেশ যেন সেই ফাঁকের উপর দাঁড়ানো একটি নড়বড়ে সেতু।

একজন নারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, চাকরি করছেন, কর্পোরেট মিটিংয়ে অংশ নিচ্ছেন  কিন্তু সেই একই সমাজ তাঁর কাছে প্রত্যাশা রাখছে "অনুগত স্ত্রী" বা "নীরব পুত্রবধূ" হওয়ার। আবার পুরুষকে শেখানো হয়েছে কর্তৃত্ব আর নিয়ন্ত্রণের পাঠ। এই দুই মানসিকতার সংঘাতই বহু ক্ষেত্রে রূপ নিচ্ছে সন্দেহ, সহিংসতা আর মানসিক ভাঙনে।

সংখ্যাগুলো বড়ই মিবাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের জরিপ বলছে, দেশে প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্বামী বা সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। প্রায় ৭০ শতাংশ নারী অন্তত এক ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন — শারীরিক, মানসিক, যৌন বা অর্থনৈতিক।


সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সহিংসতার বড় অংশ ঘটছে ঘরের ভেতরে। পরিবার — সমাজের সবচেয়ে নিরাপদ প্রতিষ্ঠান বলে যাকে আমরা মনে করি — সেই জায়গাই অনেকের জন্য পরিণত হচ্ছে মানসিক যুদ্ধক্ষেত্রে। আশ্রয়ের জায়গা হয়ে উঠছে চাপের কক্ষ।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম এই অবস্থাকে বলেছিলেন  (Anomie) বা নীতিগত শূন্যতা। যখন পুরনো নিয়ম দুর্বল হয়ে পড়ে, কিন্তু নতুন মূল্যবোধও জায়গা করে নিতে পারে না — তখন মানুষ পড়ে যায় এক গভীর দিকহীনতায়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় বিচ্ছিন্নতা, হতাশা আর বিচ্যুতি।

আজকের নগর মধ্যবিত্ত জীবন অনেকখানি সেই ছবিই তুলে ধরে। সম্পর্ক আছে, কিন্তু স্থিরতা নেই। ভালোবাসা আছে, কিন্তু নিরাপত্তা নেই। প্রযুক্তিগত সংযোগ বাড়ছে, কিন্তু আবেগগত দূরত্বও বাড়ছে। একই বিছানায় থেকেও দুজন মানুষ মানসিকভাবে বহু দূরে।

এই সংকটে সোশ্যাল মিডিয়া যোগ করেছে নতুন মাত্রা। আগে সন্দেহের পরিসর ছিল সীমিত; এখন একজন মানুষের সম্পর্ক, যোগাযোগ, দৈনন্দিন জীবনসহ সব কিছুই দৃশ্যমান, তুলনাযোগ্য। ইনবক্স, মেসেঞ্জার, ডিজিটাল অন্তরঙ্গতা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে সম্পর্কের এক নতুন জগৎ, যার জন্য সমাজের মানসিক প্রস্তুতি এখনো অসম্পূর্ণ। ওই জরিপেও প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতাকে নতুন হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ফলে প্রেম ও দাম্পত্য সম্পর্ক এখন কেবল আবেগের জায়গা নয়। এটি পরিণত হচ্ছে ক্ষমতা, নজরদারি আর অনিরাপত্তার ক্ষেত্রে। একজন সঙ্গী অন্যজনের ফোন চেক করছেন, অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন, সন্দেহ করছেন। বিশ্বাসের জায়গাটুকু সংকুচিত হয়ে পরিণত হচ্ছে ডিজিটাল নজরদারিতে।

ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্থনি গিডেনস বলেছিলেন, আধুনিক সমাজে সম্পর্ক টিকে থাকে আবেগগত সন্তুষ্টির উপর ভিত্তি করে, সামাজিক বাধ্যবাধকতার উপর নয়। কিন্তু বাংলাদেশে বিবাহকে এখনো অনেকাংশে সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়  যেখানে ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে পারিবারিক মর্যাদা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই কেউ যখন নিজের আবেগগত স্বাধীনতা খোঁজে, সমাজ তাকে ঠেলে দেয় অপরাধবোধ আর নৈতিক সংকটের মধ্যে।

এই দ্বন্দ্বই আজকের বাংলাদেশের বহু ট্র্যাজেডির নীরব কারণ।

সমস্যাটি কেবল "নৈতিক অবক্ষয়" নয়। সমস্যার মূলে আছে রূপান্তরের অসম গতি। আমরা আধুনিকতার ফল গ্রহণ করেছি, কিন্তু তার জন্য দরকারি মানসিক প্রস্তুতি, সম্পর্কের নতুন নৈতিকতা আর সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়তে পারিনি। প্রযুক্তি গ্রহণ করেছি, কিন্তু আবেগগত শিক্ষাকে গুরুত্ব দিইনি। ব্যক্তিস্বাধীনতার ভাষা শিখেছি, কিন্তু পারস্পরিক সম্মানের সংস্কৃতি তৈরি করতে পারিনি।

ফলে সমাজ হয়ে উঠেছে নদীর উপর নির্মিত একটি আধা-সম্পূর্ণ সেতু যার এক প্রান্ত পৌঁছে গেছে ভবিষ্যতে, আরেক প্রান্ত আটকে আছে অতীতে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন এক বিভ্রান্ত মানুষ, যিনি জানেন না কোন মূল্যবোধে ভরসা রাখবেন।

এই সংকট থেকে বেরোতে হলে কেবল আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিকীকরণের নতুন ভাষা, আবেগগত শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলার সাহস  এবং পরিবারকে "কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠান" থেকে "সহমর্মিতার প্রতিষ্ঠান"-এ রূপান্তরিত করার সদিচ্ছা। নাহলে প্রযুক্তিগত আধুনিকতা যতই বাড়ুক, সমাজের ভেতরের শূন্যতা কেবল বিস্তৃতই হবে  আর সেই শূন্যতার অন্ধকারে জন্ম নিতে থাকবে নতুন নতুন সহিংসতা।

 লেখক-শিক্ষক,  নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


এ সম্পর্কিত আরো খবর