বিশ্বের বুকে স্থাপত্যকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এবং ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ভারতের আগ্রার বিশ্ববিখ্যাত তাজমহলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর আইনি ও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভারতের উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাইকোর্ট সম্প্রতি এক ঐতিহাসিক শুনানিতে কেন্দ্রীয় সরকার এবং আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াকে (এএসআই) নোটিশ জারি করে উত্তর প্রদেশেরই আগ্রা আদালতের একটি অতীত আদেশ সম্পর্কে তাঁদের আনুষ্ঠানিক মতামত জানতে চেয়েছেন। মূলত এই নোটিশ জারির মধ্য দিয়েই তাজমহলের কপালে আগামী দিনে কী লেখা আছে, তা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জল্পনা-কল্পনা শুরু হলো। আগ্রার নিম্ন আদালত অতীতে তাজমহল প্রাঙ্গণে বৈজ্ঞানিক জরিপ ও সশরীরে ভিডিওগ্রাফির জন্য অ্যাডভোকেট-কমিশনার নিয়োগের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল। সেই খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রিভিশন পিটিশনের ওপর ভিত্তি করেই এবার এলাহাবাদ হাইকোর্ট সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের মনোভাব জানতে চেয়েছেন।
আদালতের এই নতুন পদক্ষেপের ফলে সারা বিশ্বের পর্যবেক্ষক ও ইতিহাসবিদদের জন্য ভারতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এই পর্যটন গন্তব্য তাজমহলের সামগ্রিক ঐতিহাসিক পরিচিতি সংকটের মুখে পড়েছে। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা ঐতিহাসিক তথ্যের বাইরে গিয়ে এই মুঘল সৌধের নিচে প্রাচীন কোনো হিন্দু মন্দিরের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করতে কেন একটি উচ্চপর্যায়ের জরিপ পরিচালনা করা যাবে না—তা নিয়েই এখন মূল আইনি লড়াই শুরু হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আবেদনকারীর পক্ষে শুনানিতে উপস্থিত প্রবীণ আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের দীর্ঘ বক্তব্য বিস্তারিতভাবে শোনার পর এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি রোহিতরঞ্জন আগরওয়ালের সমন্বয়ে গঠিত একক বেঞ্চ জানতে চান, কেন এই ঐতিহাসিক সৌধের ভেতর ও বাইরে সুনির্দিষ্ট জরিপ করা যাবে না। আদালতে আবেদনকারী আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের মূল দাবি হলো, বিশ্বখ্যাত এই স্মৃতিসৌধটি আসলে কোনো মুঘল স্থাপত্য নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত প্রাচীন শিব মন্দির, যার আদি নাম ছিল ‘তেজো মহালয়া’। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এই মন্দিরটি আদি সনাতন ধর্মের দেবতা ভগবান মহাদেবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছিল। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দেওয়ানি মামলায় খোদ হিন্দু দেবতা মহাদেবকে অন্যতম প্রধান ও মূল পক্ষ হিসেবে আইনি কাঠামোতে দাঁড় করানো হয়েছে, যেভাবে সাধারণ কোনো রক্ত-মাংসের মানুষকে মামলার বাদী বা বিবাদী করা হয়। মহাদেবকে মূল পক্ষ করে তাঁর ‘পরম বন্ধু’ হিসেবে আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈন এবং তাঁর আরও বেশ কয়েকজন অনুসারী ভক্তের যৌথ মাধ্যমে এই বিতর্কিত পিটিশনটি উচ্চ আদালতে দায়ের করা হয়েছে।
পূর্বে ভারতে সংঘটিত বিতর্কিত রামমন্দির ও বাবরি মসজিদ ভূমি মালিকানা মামলা নিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়ের পর, হিন্দুত্ববাদী আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের ছেলে আইনজীবী বিষ্ণুশঙ্কর জৈন এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে, যেসব প্রাচীন মুসলিম সৌধ বা মসজিদের নিচে হিন্দুদের পবিত্র ধর্মীয় স্থান রয়েছে বলে তারা মনে করেন, তেমন সৌধগুলোর একটি দীর্ঘ ও সুনির্দিষ্ট তালিকা তাঁরা ইতিমধ্যে প্রস্তুত করেছেন। বিষ্ণুশঙ্কর জৈন তখন স্পষ্ট করে বলেছিলেন, এই তালিকাটি অত্যন্ত দীর্ঘ এবং তাঁরা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা এসব বিতর্কিত স্থান বেছে বেছে বের করে একের পর এক আইনি মামলা দায়ের করবেন। বর্তমানে সেই পূর্বপরিকল্পিত এজেন্ডা অনুযায়ী পিতা-পুত্রের এই আইনজীবী জুটি একের পর এক মামলা করে চলেছেন। আইনজীবী বিষ্ণুশঙ্কর জৈন এই প্রতিবেদককে আরও নিশ্চিত করেছিলেন যে, তাঁরা সরাসরি ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘হিন্দু মহাসভা’র আইনি ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছেন।
এলাহাবাদ হাইকোর্টে দায়েরকৃত এই চাঞ্চল্যকর মামলায় বাদীপক্ষ মূলত একটি ঘোষণামূলক ডিক্রি এবং স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছে। তাদের মূল আইনি বক্তব্য হলো, যেহেতু এই স্মৃতিসৌধটি আসলে একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির, তাই বাদীপক্ষ তথা সনাতন ধর্মাবলম্বী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সকল সদস্যের তাজমহল প্রাঙ্গণের ভেতরে প্রবেশ করে নিয়মিত পূজা-অর্চনা ও ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করার আইনি অনুমতি দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। বাদীপক্ষের সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই এলাহাবাদ হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর বা এএসআই-এর কাছে জানতে চেয়েছেন, পুরো বিষয়টি স্থায়ীভাবে নিষ্পত্তি করার জন্য কেন একটি পূর্ণাঙ্গ প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ করা হবে না। উল্লেখ্য, ভারতের ইতিহাসে বিতর্কিত রাম জন্মভূমি ও বাবরি মসজিদ ভূমির মালিকানাসংক্রান্ত বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে এই এলাহাবাদ হাইকোর্টই অতীতে সবচেয়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এই হাইকোর্টের লখনৌ বেঞ্চ ২:১ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এক ঐতিহাসিক রায় দিয়ে অযোধ্যার বিবদমান ২ দশমিক ৭৭ একর জমি হিন্দু দেবতা রাম লালা, রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রাচীন সংগঠন নির্মোহী আখড়া এবং মুসলিমদের সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ডের মধ্যে সমান তিন ভাগে ভাগ করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন।
তাজমহলের এই আইনি লড়াইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে আবেদনকারীরা জোর দিয়ে দাবি করেছেন, ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৫-এর অধীনে এই ঐতিহাসিক সৌধের ভেতরে প্রবেশ করে ‘দর্শন’ ও ‘পূজা’ করার মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার সাধারণ হিন্দুদের রয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে তাজমহলে সুনির্দিষ্ট জরিপ কাজ পরিচালনার উদ্দেশ্যে একজন অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগের জন্য আগ্রার আদালতে আবেদন করা হয়েছিল। তবে ওই সময় আগ্রার অতিরিক্ত দেওয়ানি বিচারক (সিনিয়র ডিভিশন) বাদীপক্ষের আবেদনটি সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছিলেন। তৎকালীন আদালত যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন যে, বাদীপক্ষ তাজমহলের ভেতরে কোনো সুনির্দিষ্ট দাগ নম্বর বা জায়গার সত্যতা নিশ্চিত করার জন্য কোনো সরকারি রাজস্ব নথি (যেমন খতিয়ান বা খসড়া রেকর্ড) আদালতে দাখিল করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়া মামলার নথিতে বর্ণনাকৃত সম্পত্তির সীমানা ও আয়তন (৭৭ বিঘা) বিবাদীপক্ষের সরকারি নথির সাথে মেলেনি। এই খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে একটি রিভিশন পিটিশন বা সংশোধনী আবেদন দায়ের করা হলে তাও রক্ষণাবেক্ষণের অযোগ্য বলে গণ্য করেন আগ্রার অতিরিক্ত জেলা জজ। মূলত নিম্ন আদালতের এই দুটি আদেশকেই সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বাদীপক্ষ এবার এলাহাবাদ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে।
মামলার আবেদনে বাদীপক্ষ ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যসংক্রান্ত কিছু দাবি উল্লেখ করে বলেছে, কথিত প্রাচীন তেজো মহালয় মন্দিরটি, যেখানে দেবতা আগ্রেশ্বর মহাদেব বিরাজ করছেন, সেটি ১১৫৫-৫৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা পরমর্দি দেব নির্মাণ করেছিলেন। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে ইউনেস্কো তাজমহলকে একটি অনন্য ‘হেরিটেজ সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং ভারত সরকারের পর্যটনবিষয়ক অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও এটি স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত রয়েছে। সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর প্রয়াত পত্নী মমতাজ মহলের গভীর স্মৃতি রক্ষার্থে এই অনন্য স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করেছিলেন। ওয়েবসাইটে মমতাজ মহল ও শাহজাহানের হাতে আঁকা প্রাচীন ছবিও রয়েছে। সাধারণ ইতিহাসবিদদের মতে, তাজমহল বানানোর কাজ শুরু হয়েছিল ১৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে এবং তা শেষ হয় ১৬৫৩ সালে। প্রায় ১০ বছর আগের এক অর্থনৈতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই স্মৃতিসৌধটির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৫০ বিলিয়ন বা ৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি, যা ভারতের পর্যটন খাতের আয়ের প্রধান উৎস।
তবে আবেদনকারী হিন্দুত্ববাদী আইনজীবীরা প্রচলিত এই ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক দলিল মানতে নারাজ। তাঁদের দাবি, সময়ের বিবর্তনে এই স্মৃতিসৌধটি একপর্যায়ে রাজা মানসিংহের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত মালিকানায় আসে এবং পরবর্তী সময়ে ১৭ শতকে জয়পুরের রাজা জয়সিংহ এই স্থানে বা প্রাসাদে অভিষিক্ত হন। এরপর মুঘল শাসক শাহজাহান ক্ষমতার জোরে রাজা জয়সিংহের কাছ থেকে কথিত ‘তেজো মহালয়া’ নামের এই রাজপ্রাসাদটি জোরপূর্বক দখল করেন এবং তাঁর মৃত রানির শবাধার বা স্মৃতিসৌধে পরিণত করেন। এই রূপান্তরের জন্য বিতর্কিত সৌধটির সনাতন কাঠামোর কিছু অংশ ভেঙে পরিবর্তন করে সেখানে ইসলামিক বৈশিষ্ট্য ও গম্বুজ যুক্ত করা হয়েছিল। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা আরও দাবি করেন, তাজমহলে অন্তত ১০৯টি এমন প্রত্নতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে যা এটি যে একটি হিন্দু মন্দির, তা সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
মামলার আবেদনে এএসআই-এর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর ‘বেআইনিভাবে’ মুসলিম সম্প্রদায়কে প্রতি শুক্রবারে এই তেজো মহালয়া বা তাজমহল প্রাঙ্গণে ‘নামাজ’ পড়ার বিশেষ অনুমতি দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ সনাতন ধর্মাবলম্বী দর্শনার্থীদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং ভবন চত্বরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তলা বা বেজমেন্ট অন্যায়ভাবে তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে। বাদীপক্ষের স্পষ্ট দাবি, হিন্দু ‘পূজা’ ও শিবের আরাধনা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এই জাতীয় সম্পত্তির ব্যবহার আইনত বেআইনি। তারা আদালতের কাছে অবিলম্বে একজন নিরপেক্ষ ফটোগ্রাফার ও ভিডিওগ্রাফার নিয়োগ দেওয়ার জন্য জরুরি আবেদন জানিয়েছেন, যাতে তালাবদ্ধ অংশগুলোর ভেতরের চিত্র ধারণ করে আদালতে বর্তমান বিচারিক প্রক্রিয়ায় গোপন দলিল হিসেবে দাখিল করা যায়। বিষয়টি নিয়ে ভারতের আইন অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে এবং আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তাজমহল নিয়ে যে আইনি বিতর্ক ৬ জুলাই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল, তা আগামী দিনে দেশটিতে এক নতুন সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াইয়ের সূচনা করবে, যার চূড়ান্ত ফল দেখতে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।