আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দুর্দান্ত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে ফারাওরা। ম্যাচের ১৫তম মিনিটে মারওয়ান আত্তিয়ার নিখুঁত কর্নার থেকে ইয়াসের ইব্রাহিম হেডে গোল করে মিশরকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। এরপর ২১তম মিনিটে পেনাল্টি পেয়েও তা গোল করতে ব্যর্থ হন খোদ আলবিসেলেস্তে অধিনায়ক লিওনেল মেসি। প্রথমার্ধের পেনাল্টি মিসের হতাশা নিয়ে বিরতিতে যায় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। বিরতির পর ৫৮তম মিনিটে ম্যাচের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্তটি আসে, যখন পাল্টা আক্রমণ থেকে মোস্তফা জিকো বল জালে জড়িয়ে মিশরকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। কিন্তু ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে দীর্ঘ ভিএআর (ভিডিও সহকারী রেফারি) পর্যালোচনার পর আক্রমণের শুরুতে মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাউল করেছিলেন—এই অভিযোগে গোলটি বাতিল করেন। অবশ্য এই ধাক্কা সামলে ৬৭তম মিনিটে হাইসেম হাসানের পাস থেকে জিকো আবারও গোল করে মিশরকে ঠিকই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন।
ম্যাচটি যখন প্রায় মিশরের হাতের মুঠোয়, ঠিক তখনই শেষ ১৫ মিনিটে শুরু হয় লিওনেল স্কালোনির দলের অতিমানবিক প্রত্যাবর্তন। ৭৯তম মিনিটে মেসির জাদুকরি অ্যাসিস্ট থেকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো হেডে গোল করে ব্যবধান কমান। এর চার মিনিট পর, ৮৩ মিনিটে গনসালো মন্তিয়েলের পাস থেকে আলবিসেলেস্তেদের সমতায় ফেরান মহাজাগতিক ফুটবলার মেসি। এরপর যোগ করা ইনজুরি সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে (৯০+২) লাউতারো মার্তিনেজের নিখুঁত ক্রস থেকে এনজো ফার্নান্দেজ মহাকাব্যিক জয়সূচক গোলটি করে আর্জেন্টিনাকে ৩-২ ব্যবধানে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে দেন। বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় নিজের ২১তম গোল নিয়ে এবং টানা ৯ বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল রেকর্ডের মাধ্যমে মেসি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এককভাবে শীর্ষে উঠে যান।
তবে মাঠের এই রোমাঞ্চ ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গন এখন উত্তাল ভিএআর বিতর্ক এবং মিশরের বিস্ফোরক সব অভিযোগে। ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে মিশরের ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো কান্নায় ভেঙে পড়ে রেফারিকে ‘জালিম’ আখ্যা দেন এবং ক্ষোভে এই বিশ্বকাপকে ‘পাতানো’ দাবি করে বলেন, ‘আর্জেন্টিনাকে আরেকটি বিশ্বকাপের জন্য অগ্রিম অভিনন্দন।’ একই সুরে মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসানও সংবাদ সম্মেলনে ফিফার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে বাকি বিশ্বকাপ বয়কটের ঘোষণা দেন। অবশ্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন-এর বিশ্লেষণে সাবেক রেফারি অ্যান্ডি ডেভিস জানিয়েছেন, ফুটবল আইন অনুযায়ী একই আক্রমণভাগের শুরুতে ফাউল থাকায় জিকোর গোল বাতিল এবং শেষ মুহূর্তে মোহাম্মদ সালাহর পেনাল্টি আবেদন নাকচ করার সিদ্ধান্তগুলো সম্পূর্ণ নিয়মসঙ্গত ছিল। ফুটবলবিশ্বে এই ম্যাচটি যেমন আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প হিসেবে স্মরণ করা হবে, তেমনি ভিএআরের চুলচেরা নিয়ম আর মিশরের লড়াকু ট্র্যাজেডির এক জ্বলন্ত দলিল হয়ে থাকবে।
আকাশজমিন / আরআর