চলতি বিশ্বকাপে মাঠের লড়াই ছাড়িয়ে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের মধ্যকার ম্যাচের পর থেকেই আলোচনা-সমালোচনা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। ওই ম্যাচে রেফারির বেশ কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবল বিশ্বে তোলপাড় চলছে, এমনকি মিশর দলের পক্ষ থেকে ম্যাচ অফিশিয়ালদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্তের দাবিও তোলা হয়েছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই নতুন করে ঘি ঢেলেছে ফিফার আরেকটি নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত, যার কেন্দ্রে আবারও রয়েছে আর্জেন্টিনার নাম।
ফ্রান্স এবং মরক্কোর মধ্যকার মহাগুরুত্বপূর্ণ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের জন্য ফিফা এমন এক রেফারি প্যানেল নিয়োগ দিয়েছে, যা চলতি বিশ্বকাপের আগের ৯৬টি ম্যাচেও দেখা যায়নি। ফুটবল ইতিহাসের এই প্রথম কোনো মেগা ম্যাচের অন-ফিল্ড এবং অফ-ফিল্ড মিলিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত পাঁচজন অফিশিয়ালের সবাই এসেছেন একই দেশ থেকে, আর সেই দেশটি হলো আর্জেন্টিনা। সবচেয়ে নাটকীয় বিষয় হলো, আর্জেন্টিনা ও মিশরের মধ্যকার বিতর্কিত ম্যাচটি যখন মাঠে চলছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিতর্কিত রেফারি প্যানেলের নাম ঘোষণা করে।
ফিফার এমন সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে চরম ক্ষোভ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ, শেষ আটের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে ফ্রান্স, যাদের সঙ্গে আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক ফুটবল ইতিহাস বেশ উত্তপ্ত। বিগত দুটি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এই দুই দল একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল। ২০১৮ সালের রাউন্ড অব সিক্সটিনে কিলিয়ান এমবাপ্পের বিধ্বংসী পারফরম্যান্সে ফ্রান্স ৪-৩ গোলে আর্জেন্টিনাকে বিদায় করেছিল। এর ঠিক চার বছর পর, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা এবং ফ্রান্সের মধ্যকার শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচটি ৩-৩ গোলে ড্র হওয়ার পর পেনাল্টি শুটআউটে ৪-২ ব্যবধানে চ্যাম্পিয়ন হয় ল্যাটিন আমেরিকার দেশটি। এমন চিরবৈরী ফুটবল সম্পর্কের সমীকরণে ফরাসি সংবাদমাধ্যম 'আরএমসি স্পোর্ট' ফিফার এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে লিখেছে, ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার ‘কোনো লজ্জা নেই’।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ফুটবলপ্রেমীরা ফিফাকে ধুয়ে দিচ্ছেন। একজন ক্ষুব্ধ সমর্থক লিখেছেন, "ফ্রান্সের ম্যাচের জন্য সব রেফারি আর্জেন্টিনার! ফিফা আবারও আর্জেন্টিনার জন্য বিশ্বকাপ কারচুপি করার সব রকম চেষ্টা চালাচ্ছে।" অন্য একজন ব্যঙ্গাত্মক পোস্টে লিখেছেন, "ফিফা এখন আর নিজেদের উদ্দেশ্য লুকাচ্ছে না। মাঠের সবাই যখন আর্জেন্টাইন, তখন আপনারা মেসিকে কেন ভিএআর পরীক্ষা করার জন্য ডেকে আনছেন না?"
বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এই ম্যাচে মূল রেফারি হিসেবে মাঠ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন আর্জেন্টিনার ফাকুন্দো টেলো। কাকতালীয়ভাবে, ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্স ও মরক্কোর মধ্যকার ম্যাচেও তিনিই রেফারির দায়িত্বে ছিলেন। মাঠে তাকে সহযোগিতা করবেন তার দুই স্বদেশি সহকারী রেফারি জুয়ান পাবলো বেলাত্তি ও গ্যাব্রিয়েল চাড। এ ছাড়া ম্যাচটিতে চতুর্থ কর্মকর্তা হিসেবে থাকবেন আরেক আর্জেন্টাইন দারিও হেরেরা এবং রিজার্ভ সহকারী রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ক্রিস্টিয়ান নাভারো।
ম্যাচের সব অফিশিয়াল একই দেশের হওয়া সত্ত্বেও এ নিয়ে বাড়তি জলঘোলা করতে নারাজ ফরাসি শিবির। পাঁচ আর্জেন্টাইন রেফারি নিয়োগ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন ফরাসি ডিফেন্ডার দায়ো উপামেকানো। তিনি ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বলেন, "রেফারি কে হচ্ছেন বা কোথা থেকে আসছেন, সেই দিকে আমরা একদমই মনোযোগ দিচ্ছি না। এর আগে আমরা কখনো এসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি। আমাদের পুরো মনোযোগ এখন শুধুই মরক্কোর বিরুদ্ধে ম্যাচের ওপর। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো এই ম্যাচটি জেতা, আমাদের কাছে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।"