ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। পাল্টাপাল্টি হামলা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তুরস্কে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তিনি স্পষ্ট করে জানান, তেহরানের সঙ্গে নতুন কোনো চুক্তিতে যেতে চান না এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ‘কাজ শেষ করার’ নির্দেশ দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, নতুন হামলার অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে।
ট্রাম্প বলেন, “যা কিছু ঘটার, তা খুব দ্রুতই ঘটবে। আমরা দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে নেই।”
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির সমঝোতা স্মারকের পর ট্রাম্পের এই অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে কৌশলগত উদ্দেশ্য থাকতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে নিতে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই হতে পারে এর লক্ষ্য। তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
যদিও ট্রাম্প পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন, তবু তিনি নতুন হামলার ইঙ্গিত দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন বাহিনী ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়। এর জবাবে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। ফলে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখতে পর্দার আড়ালে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পারস্পরিক অবিশ্বাস চরমে পৌঁছালেও যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে একাধিক দেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
জানা গেছে, পাকিস্তান ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মিশরের গোয়েন্দাপ্রধান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং সৌদি আরবের নেতারা মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় যুক্ত রয়েছেন।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটনই পূর্ববর্তী সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘন করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাতের মধ্যেও আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মাইকেল আইজেনস্ট্যাট মনে করেন, ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্য মূলত আলোচনায় বাড়তি সুবিধা নেওয়ার কৌশল হতে পারে। তবে আলী বায়েজ সতর্ক করে বলেছেন, সামরিক চাপ সৃষ্টি করে কূটনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং যেকোনো সময় এটি পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত হলে দেশটি আবারও আলোচনায় ফিরতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও জ্বালানি তেলের বাজার এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
আগামী চার মাস পর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং তেলের দাম বাড়তে থাকলে তা ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।