উপসাগরীয় অঞ্চলে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই অচলাবস্থা এখন যুদ্ধ পরিস্থিতি ধারণ করেছে। গত কয়েক মাসের নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ধূলিসাৎ করে দিয়ে দুই দেশই এখন একে অপরের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় একের পর এক বিধ্বংসী আক্রমণ চালাচ্ছে। ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে এবার ওমান, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন দিয়ে পাল্টা আঘাত হেনেছে তেহরান। বিশেষ করে বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি আস্ত ড্রোনবহর পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি করেছে ইরান।
আমেরিকার নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে তারা ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে। ডজন ডজন ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানার দাবি করেছে ওয়াশিংটন। এই অভিযানে মার্কিন বাহিনী তাদের অত্যাধুনিক ফাইটার বিমান, নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ এবং ইতিহাসের প্রথমবারের মতো একমুখী আত্মঘাতী ড্রোন ও আত্মঘাতী সামুদ্রিক ড্রোন ব্যবহার করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, গত রাতে ইরানি সামরিক কাঠামোর ওপর অত্যন্ত ভয়াবহ বোমাবর্ষণ সম্পন্ন করা হয়েছে। মার্কিন সামরিক সূত্র মতে, ইরানের উপকূলীয় রাডার স্টেশন, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি লক্ষ্য করে প্রায় ১৪০টি স্থানে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে।
মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন
আমেরিকার এই আগ্রাসনের জবাবে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়নি তেহরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। তারা বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ஜর্ডান এবং ওমানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। আইআরজিসির মহাকাশ বাহিনী এক বিশেষ বিবৃতিতে দাবি করেছে, তাদের নিখুঁত ড্রোনের আঘাতে বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর একটি পুরো ড্রোনবহর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এছাড়া মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ হেলিকপ্টার রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র, অত্যাধুনিক পি-৮ বিমান রাখার হ্যাঙ্গার এবং ড্রোন কমান্ড-অ্যান্ড-কট্রোল সেন্টার সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। কুয়েতের আলী সালেম এবং আহমাদ আল-জাবের ঘাঁটিতেও ইরানের ‘বিধ্বংসী ড্রোন’ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে বলে ইরানি গণমাধ্যমগুলো দাবি করেছে।
ইরানের অভ্যন্তরে ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষোভ
আল–জাজিরার একটি বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, মার্কিন যুদ্ধবিমানের ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের মাহশাহর অঞ্চলের একটি কৃষি পানি পাম্পিং স্টেশন ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ঘটনায় পাম্পিং স্টেশনের একজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত এবং আরও চারজন সাধারণ নাগরিক গুরুতর আহত হয়েছেন। খুজেস্তানের নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগবিষয়ক উপ-গভর্নর ওয়ালিওল্লাহ یادাতি নিশ্চিত করেছেন যে, শনিবার ভোরের দিকে এই কাপুরুষোচিত হামলাটি চালানো হয়। মার্কিন বাহিনী মূলত ইরানের তিনটি প্রধান প্রদেশ—খুজেস্তান, হরমোজগান এবং সিস্তান-বেলুচিস্তানের জাস্ক, সিরিক, কেশম দ্বীপ ও বন্দর আব্বাসের মতো কৌশলগত রাডার সাইটগুলোকে নিশানা করেছে। এছাড়া খোন্দাব শহরের একটি পানি শোধনাগারের কাছেও বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
কূটনৈতিক অঙ্গনে চরম হতাশা
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এখন গভীর সংকটে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের এই হঠকারী ও উসকানিমূলক আক্রমণ পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফিরিয়ে আনার সমস্ত আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে পুরোপুরি ব্যর্থ করে দিয়েছে। তেহরানের অভিযোগ, হরমুজ প্রণালির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় মার্কিন প্রশাসন অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ করে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট করছে এবং সমগ্র অঞ্চলে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। দুই দেশের এই অনড় অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।