সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প প্রথমে ঘোষণা দেন, ইরানি নৌপরিবহনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ আবার কার্যকর করা হবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী সব জাহাজের কাছ থেকে ২০ শতাংশ ফি আদায়ের কথাও জানান। তার যুক্তি ছিল, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের যে ব্যয় হচ্ছে, তা মেটাতেই এই অর্থ নেওয়া হবে।
তবে একদিনের ব্যবধানে তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন। নতুন প্রস্তাবে ট্রাম্প জানান, উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদার করেই নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে চায় ওয়াশিংটন। অর্থ আদায়ের পরিবর্তে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকেই তিনি গুরুত্ব দেন।
ট্রাম্পের এই অবস্থান পরিবর্তন এমন সময়ে এলো, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত চার মাসের বেশি সময় ধরে চলছে। এক মাস আগে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হলেও তা স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং মাঝেমধ্যেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটায় সেই সমঝোতার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করতে চান না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ জনপ্রিয় নয়। সংঘাত দীর্ঘ হলে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে, পাশাপাশি মার্কিন সেনা ও মিত্রদের ওপর ইরানের হামলার ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, নতুন কোনো কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়া যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানোও ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে সহজ নয়। কারণ তিনি এমন একটি চুক্তি করতে চান, যেটিকে ২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের পারমাণবিক চুক্তির চেয়েও সফল বলে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ-এর মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক রোজমেরি কেলানিডের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তির সম্ভাবনা খুবই কম। তার ভাষায়, এই সংঘাত ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘমেয়াদি অমীমাংসিত যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ এবং বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা জোরদার হওয়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবারও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়।
সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র কিছু সাফল্য পেলেও রাজনৈতিক সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হলেও দেশটি এখনো হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা ধরে রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এদিকে, ট্রাম্পের ২০ শতাংশ ফি আরোপের প্রস্তাব নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ এক মাস আগেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো ধরনের টোল বা ফি আরোপের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক আইনে কোনো রাষ্ট্রের এ ধরনের ফি আদায়ের সুযোগ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক ও কূটনৈতিক—দুই ক্ষেত্রেই ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে ট্রাম্প এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। যুদ্ধ থামানোর ইচ্ছা থাকলেও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ এখনো তার নাগালের বাইরে।