মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সামরিক সংঘাত এখন আর কেবল সামরিক ঘাঁটির লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, তা রূপ নিয়েছে এক চরম অমানবিক ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে। টানা সাত দিন ধরে ইরানের বুকে বিধ্বংসী আক্রমণ চালানোর পর, এবার বেসামরিক ও জনকল্যাণমূলক স্থাপনাকেও নিজেদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে মার্কিন বাহিনী। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এক পানি শোধনাগারে মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে বোমা বর্ষণ করা হয়েছে। এর ফলে অন্তত ২০টি প্রত্যন্ত গ্রামের প্রায় ১০ হাজার সাধারণ মানুষের সুপেয় পানির সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। শনিবার (১৮ জুলাই) কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে দেশটির ‘হরমোজগান ওয়াটার অ্যান্ড ওয়েস্টওয়াটার কোম্পানি’-র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) হামজেহ পুর জানান, ইরানের জাস্ক কাউন্টির উপকূলীয় বুঞ্জি গ্রামে অবস্থিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানি পরিশোধন পাম্পকে নিশানা করে মার্কিন বাহিনী এই নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে। হামজেহ পুর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পৈশাচিক বোমাবর্ষণকে ‘ধারাবাহিক যুদ্ধাপরাধ ও সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সমুদ্র থেকে পানি তোলার একটি প্রধান পাম্পিং স্টেশন এবং বুঞ্জি পানি পরিশোধন কেন্দ্রের মূল বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমারটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে ওই অঞ্চলের হাজার হাজার নিরীহ বেসামরিক নাগরিক এই তীব্র গরমের মধ্যে চরম সুপেয় পানির সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন।
এদিকে মার্কিন এই আগ্রাসনের জবাবে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে থাকা ওয়াশিংটনের মিত্রদেশগুলোর ওপর সমানে পাল্টা আঘাত হানছে তেহরানও। কুয়েতের বিদ্যুৎ, পানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কুয়েতের মাটিতে ইরানের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দেশটির একটি প্রধান বিদ্যুৎ ও পানি পরিশোধন কেন্দ্রের একটি অংশে দাউ দাউ করে আগুন ধরে যায়। কুয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং কেন্দ্রের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাৎক্ষণিকভাবে কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে বাধ্য হয়েছে। তবে জরুরি পরিকল্পনা সক্রিয় থাকায় সামগ্রিক বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেছে কুয়েত।
এর আগে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম (CENTCOM) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করা এক জরুরি বার্তায় জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ তথা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশনা মেনেই ইরানে টানা ৭ রাত ধরে এই বিশেষ সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সেন্টকমের দাবি, ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই আকাশ ও সমুদ্রপথের আক্রমণ অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনকে অবিলম্বে এই একতরফা বিমান অভিযান বন্ধ করার শেষ হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। শুক্রবার রাতের এই বিধ্বংসী হামলার পর এক কড়া বার্তায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি অবিলম্বে এই বর্বরোচিত হামলা বন্ধ না করে, তবে ইরান নিজেকে আর কেবল সীমিত পাল্টা হামলার মধ্যে আটকে রাখবে না। তেহরান এবার পূর্ণমাত্রায় সর্বাত্মক যুদ্ধে নামতে বাধ্য হবে এবং সেক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো দেশের রাজনৈতিক সীমান্ত আর সুরক্ষিত থাকবে না।” দুই পক্ষের এই অনড় অবস্থানের কারণে পারস্য উপসাগর এখন এক মহাবিনাশী যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।