ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান ডিএমপির ৩ সহকারী পুলিশ কমিশনারকে নতুন পদে বদলি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১০৭ ডলার হরমুজে নতুন নৌপথ: ওমানের আঞ্চলিক বৈঠক স্থগিত দেশে ফিরে ইতালিতে হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুললেন অভিনেত্রী বাঁধন ব্রিকসে বিশ্বনেতাদের দেওয়া হলো নিরামিষ খাবার: বিজেপি-কংগ্রেস তুমুল বিতর্ক সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বর: ডেঙ্গু ও হামের সঙ্গে বাড়ছে টাইফয়েড ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই কি থামবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ? ‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে

১৬ বছর পর বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেন

আজ রাতে তিকিতাকার জাদুতে কি পরাস্ত হবে আর্জেন্টিনা?


  • আপলোড সময় : রবিবার ১৯ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৬:০৮ পিএম

ক্রীড়া ডেস্কঃ

ফুটবলের সবচেয়ে দুর্ভাগা দেশগুলোর তালিকা করলে স্পেন ওপরের দিকেই থাকবে। পৃথিবীর অন্যতম সেরা ঘরোয়া লিগ, রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার মতো বিশ্বসেরা সব ক্লাব, নিজস্ব ও অনন্য ফুটবল দর্শন, অসংখ্য দুর্দান্ত প্রতিভা আর সমৃদ্ধ ফুটবল সংস্কৃতি থাকার পরও স্প্যানিশদের ঝুলিতে রয়েছে মাত্র একটি বিশ্বকাপ। তবে সেই আক্ষেপ ও ভাগ্য বদলের মোক্ষম একটা সুযোগের সামনে আজ দাঁড়িয়ে তারা। এজন্য আজকের মেগা ফাইনালে তাদের হারাতে হবে অদম্য ও বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুরন্ত ছন্দে থাকা লিওনেল মেসি ও হুলিয়ান আলভারেজদের কি আজ আটকাতে পারবে স্প্যানিশরা?

স্পেনের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বড় শিরোপা ছিল ১৯৬৪ সালের ইউরো জয়। এরপরের দীর্ঘ ৪২ বছরে তাদের সর্বোচ্চ অর্জন ছিল শুধু বড় কোনো টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানো। তবে গত ১৮ বছরে চিত্রটা পুরোপুরি বদলে গেছে। এই দেড় যুগে একটি বিশ্বকাপসহ মোট চারটি মেজর ট্রফি জিতেছে তারা। আজ রাতে যদি তারা বিশ্বকাপ জিততে পারে, তবে এই সংখ্যাটা বেড়ে ৫-এ দাঁড়াবে। এছাড়া উয়েফা nেশনস লিগ হিসাব করলে এ সময় তারা আরও ৩টি মেগা ফাইনাল খেলেছে।

গত দেড় যুগে স্পেনের এই অবিশ্বাস্য সফলতার পেছনে কারণ কী? এককথায় তার জবাব হলো—‘তিকিতাকা’। সাবেক সফল কোচ ভিসেন্ত দেল বক্সের অধীনে জাভি, ইনিয়েস্তা, পুয়েলরা মাঠে এই কৌশলের সবচেয়ে সফল ও শৈল্পিক প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। তিকিতাকার জাদুতে বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবলপ্রেমীকে মুগ্ধ করে ২০১০ সালে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ জিতে নেয় স্পেন। এই সোনালী প্রজন্মটি তাদের আগমনী বার্তা দিয়েছিল ২০০৮ ইউরো জিতে এবং ২০১২ ইউরো ঘরে তুলে তারা সফলতার বৃত্ত পূরণ করে।
জাভি-ইনিয়েস্তারা আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পর স্প্যানিশ ফুটবলে একটা বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। তখন তিকিতাকার পজেশনাল পাসিং ফুটবল দর্শকদের মুগ্ধ করার বদলে উল্টো বিরক্তিকর ও উদ্দেশ্যহীন হয়ে উঠেছিল। তবে লুইস দে লা ফুয়েন্তে স্পেনের কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর আবার নতুন করে জেগে উঠেছে তিকিতাকা। তাঁর জাদুকরি অধীনেই লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসরা ২০২৪ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়ন হন, আর এবার তারা পা রেখেছেন বিশ্বকাপের ফাইনালে।

বর্তমান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে অবশ্য পুরনো তিকিতাকায় কিঞ্চিৎ আধুনিক সংযোগ ঘটিয়েছেন। বলের দখল নিজেদের কাছে রেখে ছোট ছোট পাসে নিখুঁত আক্রমণ গড়ে তোলার পাশাপাশি, দলের প্রয়োজনে লম্বা পাসের (লং বল) অত্যন্ত কার্যকরী ও গতিময় কাউন্টার অ্যাটাকও করে এই স্পেন। ফুয়েন্তের বর্তমান দলটির আরও একটি সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো আসরের অন্যতম দুর্ভেদ্য রক্ষণভাগ গড়ে তোলা।
অভিজ্ঞ আইমারিক লাপোর্তে ও বার্সেলোনার তরুণ তুর্কি পাউ কুবারসির সমন্বয়ে তারা দারুণ এক সেন্ট্রাল ডিফেন্স লাইন গড়ে তুলেছে। তাদের সঙ্গে দুই পাশে থাকা দুই উইং-ব্যাক মার্ক কুকুরেয়া ও পেদ্রো পোরো কেবল প্রতিপক্ষের আক্রমণই ঠেকান না, বরং দুরন্ত গতিতে উইং ধরে ওপরে উঠে প্রতিপক্ষের বক্সে ক্রস ফেলতেও দারুণ দক্ষ। রাইট-ব্যাক পোরো তো রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি টুর্নামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ দুটি গোলও করেছেন।
সেমিফাইনালে হটফেভারিট ফ্রান্সের বিপক্ষে একটু ভিন্ন ও কড়া ডিফেন্সিভ কৌশল অবলম্বন করেছিল স্পেন। দুর্দান্ত ছন্দে থাকা ফরাসি আক্রমণভাগের তিন সেনা—কিলিয়ান এমবাপ্পে, মাইকেল ওলিসে ও উসমান দেম্বেলেকে তারা মাঠের কোথাও খেলার ন্যূনতম জায়গাই দেননি। চার ডিফেন্ডারের সঙ্গে মাঝমাঠের তিন প্রধান সেনানি রদ্রি, ফ্যাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমো মিলে এমন এক নিরেট ব্লক তৈরি করেছিলেন, যা ফরাসিদের কোনো ফাঁকা জায়গা (স্পেস) দেয়নি।

আর্জেন্টিনাকেও কী স্পেনের এই বিশেষ কৌশলে আটকানো সম্ভব? এখানে স্পেনের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা ও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে আর্জেন্টিনার ‘কখনো হার না মানা’ অদম্য মানসিকতা। এবারের বিশ্বকাপে নকআউটের প্রতিটি ম্যাচেই দারুণ সব মহানাটকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে লাতিন পরাশক্তিরা। যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাদের হাল না ছাড়ার মানসিকতার জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তাদের দলে আছেন লিওনেল মেসির মতো একজন ফুটবল জাদুকর, যিনি কিনা চোখের পলকে এক মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের পুরো ফলাফল একাই নির্ধারণ করে দিতে পারেন!
সেমিফাইনালে এমবাপ্পে কিংবা দেম্বেলেকে যেভাবে ঠেকিয়েছিল স্পেন, ফাইনালের মঞ্চে মেসি-আলভারেজদের বিপক্ষেও তারা ঠিক একই রণকৌশল অবলম্বন করতে পারে। ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রেখে পাসিং ফুটবলের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে নিজেদের পোস্ট থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখাই হতে পারে স্পেনের সাফল্যের চাবিকাঠি।

স্পেনের জন্য আরেকটি বড় ইতিবাচক দিক হলো তাদের খেলোয়াড়দের ইউরোপীয় ফুটবল সংস্কৃতির গভীর অভিজ্ঞতা। স্পেনের বিশ্বকাপের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের প্রত্যেকেই ইউরোপের সেরা পাঁচ লিগের বড় বড় নামী ক্লাবে খেলেন। এর মধ্যে পজেশনভিত্তিক ছোট ছোট পাসে হাই-প্রেসিং ফুটবলের জন্য বিশ্ববিখ্যাত ক্লাব বার্সেলোনা থেকেই এসেছেন সর্বোচ্চ আটজন খেলোয়াড়। এই আটজন ফুটবলার দলে থাকার কারণেই বার্সার চেনা পজেশনাল কৌশল নিয়ে নতুন করে খুব বেশি কাজ করতে হচ্ছে না কোচ লা ফুয়েন্তেকে।

মাঝমাঠের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই পাসিং ফুটবলের আরেক কারিগর এবং ম্যানচেস্টার সিটিতে পেপ গার্দিওলার অন্যতম প্রধান শিষ্য রদ্রিগো হার্নান্দেজ (রদ্রি)। সিটির এই মিডফিল্ডার ইংলিশ ক্লাবটির হয়ে ইতিমধ্যে ১৩টি শিরোপা জিতেছেন এবং সে সঙ্গে ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অর জয়ের অনন্য কীর্তি গড়েছেন।
স্পেনের আরেকটি বড় শক্তির জায়গা হলো তাদের দুই উইং। দুই উইংয়ে তাদের আক্রমণ ও রক্ষণের কম্বিনেশনটা এককথায় দারুণ। দুই উইং-ব্যাক মার্ক কুকুরেয়া ও পেদ্রো পোরোর সামনে আক্রমণভাগে গতি ছড়ানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছেন লামিনে ইয়ামাল ও আলেক্স বায়েনা। ফাইনালের মেগা মঞ্চে আর্জেন্টিনার ডিফেন্সের জন্য উইং থেকে ধেয়ে আসা স্পেনের এই ক্ষুরধার আক্রমণগুলো ঠেকানোই আজ রাতের সবচেয়ে বড় ও কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে পারে। 


এ সম্পর্কিত আরো খবর