আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সৌদি আরবকে নিজস্ব মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দিয়ে একটি বহুল আলোচিত ও সংবেদনশীল পারমাণবিক চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত স্বাক্ষর না মেলায় চুক্তিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই চুক্তির প্রাথমিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও রূপরেখা প্রস্তুতের কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। তবে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনার কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এতে স্বাক্ষর করতে কিছুটা বিলম্ব করছেন বলে জানা গেছে। এর পাশাপাশি মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ার ভয়ও কাজ করছে হোয়াইট হাউসের নীতি-নির্ধারকদের মনে।
সাধারণত বেসামরিক বা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কোনো দেশ ইউরেনিয়াম নিজে সমৃদ্ধ না করে আন্তর্জাতিক বাজার বা অন্য কোনো দেশ থেকে আমদানি করে থাকে। কারণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ হলো পারমাণবিক বোমা বা মারণাস্ত্র তৈরির সবচেয়ে মূল ও প্রাথমিক উপায়। পরমাণু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কঠোর ও আন্তর্জাতিক বাধ্যতামূলক নিয়ম না থাকলে এই চুক্তির সুযোগ নিয়ে সৌদি আরব ভবিষ্যতে সহজেই পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করে ফেলবে। এর আগে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন—ইরান যদি পরমাণু বোমা বানায়, তবে সৌদি আরবও বসে থাকবে না, তারাও তা বানাবে।
তবে এই খসড়া চুক্তির সবচেয়ে উদ্বেগের ও বিতর্কিত দিক হলো, এতে জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি সংস্থা (আইএইএ)-র কঠোর ও বাধ্যতামূলক তদারকির আন্তর্জাতিক নিয়মটি রাখা হয়নি। এর ফলে আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি চাইলেই সৌদির যেকোনো সন্দেহভাজন পরমাণু স্থাপনায় আকস্মিক পরিদর্শন বা তল্লাশি চালাতে পারবে না। পুরো প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক মহলের তদারকি এড়িয়ে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এর আগে ২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) নিজস্ব মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রযুক্তিগত লোভ ত্যাগ করে কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে আমেরিকার সাথে পরমাণু চুক্তি করেছিল। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও বৈশ্বিক সুরক্ষার ইতিহাসে সেটি ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা আদর্শ নিয়ম হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কিন্তু সৌদির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সেই কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, সৌদির মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মতো স্পর্শকাতর প্রযুক্তি দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, ভবিষ্যতে যেকোনো ভূ-রাজনৈতিক সংকটে রিয়াদ যেকোনো সময় এই পরমাণু কেন্দ্রগুলো সম্পূর্ণ নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারে।
অন্যদিকে, চুক্তির পক্ষে থাকা মার্কিন লবিস্টদের প্রধান যুক্তি হলো—এই মেগা চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকার পারমাণবিক প্রযুক্তি খাতের ব্যবসার বড় ধরনের আর্থিক লাভ হবে। এছাড়া ওয়াশিংটন যদি রিয়াদকে এই সুবিধা না দেয়, তবে সৌদি আরব হয়তো রাশিয়া কিংবা চীনের কাছ থেকে আরও সহজ শর্তে ও আন্তর্জাতিক নিয়ম না মেনেই এই প্রযুক্তি পেয়ে যাবে। তবে চুক্তির কঠোর বিরোধীদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কেবল নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থে এভাবে আন্তর্জাতিক নিয়ম শিথিল করে চুক্তি করে, তবে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।