বিশ্বকাপ ফুটবলের মহোৎসবের চূড়ান্ত লড়াই শেষে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে স্পেন। রোববারের রোমাঞ্চকর ফাইনালে জাতীয় দলের এই ঐতিহাসিক জয়ের পর পুরো স্পেনজুড়ে যে উল্লাসের জোয়ার বয়ে যায়, তা কেবল আকাশ-বাতাসই মুখরিত করেনি, কাঁপিয়ে দিয়েছে ভূগর্ভকেও। দলের তারকা ফরোয়ার্ড ফেরান তোরেসের চোখধাঁধানো গোলে স্প্যানিশদের দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয় নিশ্চিত হতেই রাজপথে নেমে আসে কোটি মানুষ। সমর্থকদের এই বাঁধভাঙা নাচ, চিৎকার আর একযোগে লাফালাফির ফলে সৃষ্টি হওয়া কম্পন দেশটির ভূকম্পন পরিমাপক যন্ত্র বা সিসমোমিটারে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
সোমবার দেশটির প্রখ্যাত ভূবিজ্ঞানীরা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, সমর্থকদের সম্মিলিত আবেগের বহিঃপ্রকাশ এবং একযোগে শারীরিক নড়াচড়ার কারণে সৃষ্ট এই শক্তিতরঙ্গ ভূগর্ভের মাটিকে মৃদু ভূমিকম্পের মতো কাঁপিয়ে তুলেছে। খবরটি প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে ক্রীড়ামোদী ও বিজ্ঞানপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে।
দেশটির শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিওসায়েন্স বার্সেলোনা সেন্টারের একদল অভিজ্ঞ গবেষক ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ইনস্টিটিউট এবং কাতালান জিওলজিক্যাল অ্যান্ড কার্টোগ্রাফিক ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন স্টেশনে ধারণ করা সংবেদনশীল উপাত্ত ও সেন্সর তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চাঞ্চল্যকর খবরের সত্যতা পেয়েছেন।
বিজ্ঞানীদের আনুষ্ঠানিক এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ফাইনাল ম্যাচ চলার সময় এবং ম্যাচ শেষে আলহেসিরাস, বার্সেলোনা, কাদিজ এবং গ্রানাদাসহ স্পেনের বেশ কয়েকটি বড় ও প্রধান শহরের ভূগর্ভস্থ ভূকম্পন সেন্সরে অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং শক্তিশালী সংকেত বা স্পন্দন ধরা পড়ে। তারা জানান, পুরো ৯০ মিনিটের টানটান উত্তেজনার খেলা চলাকালীন ভূকম্পন সেন্সরগুলোতে স্পষ্ট তিনটি পৃথক কম্পনসংকেত বা পিক পয়েন্ট চিহ্নিত করা গেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেন্সরে প্রথম কম্পনের তরঙ্গটি ধরা পড়ে যখন ফেরান তোরেস প্রতিপক্ষের জাল ভেদ করে দলকে কাঙ্ক্ষিত জয়সূচক গোলটি উপহার দেন। ওই মুহূর্তে স্টেডিয়ামসহ সারাদেশের ফ্যান জোনে উপস্থিত লাখ লাখ ফুটবলপ্রেমী একযোগে শূন্যে লাফিয়ে ওঠেন। এরপর দ্বিতীয় কম্পনসংকেতটি ধরা পড়ে যখন স্পেনের অপর একটি গোল ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর প্রযুক্তির মাধ্যমে নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে বাতিল ঘোষণা করা হয়। তখন দর্শকদের আকস্মিক হতাশা, চিৎকার ও ক্ষোভ প্রকাশ সেন্সরে সংকেত হিসেবে ধরা দেয়।
তবে ভূগর্ভস্থ সেন্সরে সবচেয়ে তীব্র ও প্রবল কম্পনের রেখা ফুটে ওঠে ম্যাচের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর। রেফারি যখন ফাইনাল বাঁশি বাজিয়ে স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বজয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই পুরো স্পেনজুড়ে সমর্থকরা আনন্দের জোয়ারে ভেসে যান। কোটি কোটি মানুষের একযোগে দৌড়াদৌড়ি, লাফানো এবং অবিরাম উল্লাসে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে, যা সিসমোমিটারে অত্যন্ত তীব্রভাবে রেকর্ড করা হয়।
স্প্যানিশ ভূবিজ্ঞানীরা বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, এই ধরনের ভূকম্পন ভূতাত্ত্বিক প্লেটের স্থানচ্যুতির কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক কোনো ঘটনা নয়। এটি মূলত মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের ফলে উদ্ভূত এক ধরনের ভূকম্পন, যাকে ভূতত্ত্বের ভাষায় ‘ইনডিউসড সিসমিসম’ বলা হয়ে থাকে। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় একই সময়ে হাজার হাজার বা লাখ লাখ মানুষের একযোগে লাফানো, অবিরাম লাফালাফি ও সম্মিলিত মাতমের ফলে বিপুল পরিমাণ যান্ত্রিক শক্তির সৃষ্টি হয়। এই মানবসৃষ্ট শক্তিই তরঙ্গের মতো মাটির গভীরে ছড়িয়ে পড়ে মৃদু কাঁপনের সৃষ্টি করে এবং সিসমোমিটারের সংবেদনশীল সেন্সরে ধরা পড়ে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ফুটবল উদযাপনের সঙ্গে ভূকম্পন সেন্সরে কাঁপন রেকর্ড হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়, তবে বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ আসরের ফাইনালে এর মাত্রা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিজ্ঞানীদের তথ্যসূত্রে আরও জানা যায়, ইতোপূর্বে ইউরো ২০২৪-এর জমজমাট ফাইনালে শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে হারিয়ে যখন স্পেন শিরোপা জিতেছিল, তখনও দেশটির সংবেদনশীল সেন্সরগুলোতে প্রায় একই ধরনের কম্পন রেকর্ড করা হয়েছিল।
সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে স্প্যানিশ ফুটবল তারকা নিকো উইলিয়ামস ও মিকেল ওইয়ারজাবালের দর্শনীয় গোলের মুহূর্তগুলোতে রাজধানী মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনা শহরের কেন্দ্রস্থলে ভূমিকম্পের মতোই কাঁপন অনুভূত হয়েছিল। সেসময়ও সমর্থকদের উন্মাদনা সিসমোমিটারে ধরা পড়ার খবরটি বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
বিজ্ঞানীদের মতে, লাখ লাখ স্প্যানিশ সমর্থকদের ফুটবল ভক্তি ও বাঁধভাঙা ভালোবাসা কীভাবে সিসমোমিটারের মতো সুক্ষ্ম ভূগর্ভস্থ যন্ত্রেও গভীর দাগ কাটতে পারে, রোববারের বিশ্বকাপ ফাইনালের এই ঘটনাটি তারই এক অনন্য ও জীবন্ত উদাহরণ হয়ে রইল। খেলাধুলার আবেগ যে পৃথিবীর মাটিকেও নাড়িয়ে দিতে পারে, তা প্রমাণ করল স্প্যানিশ ভক্তদের এই ঐতিহাসিক জয়োল্লাস।