ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২

দল থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদের কী হবে?


  • আপলোড সময় : বুধবার ২২ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৮:০২ পিএম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার কারণে আলোচনায় আসা সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী। এখন তাঁর সংসদ সদস্যপদ থাকবে কি না, সে প্রশ্ন সামনে এসেছে।

নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে তাঁকে হয় কোনো দলের মনোনীত প্রার্থী হতে হয় অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হয়। দলীয় প্রার্থীরা সংসদে দলীয় সংসদ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতার কথা বলা আছে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে এবং জাতীয় নির্বাচন সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও)। এখানে যেসব অযোগ্যতার কথা বলা আছে, নির্বাচিত হওয়ার পরও কারও সে অযোগ্যতা তৈরি হলে তিনি পদ হারাতে পারেন।

যেসব কারণে কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য বিবেচিত হন, সেগুলো সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে। তার একটি হলো নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধ। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। সংবিধানে বলা আছে, কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হবার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাঁর মুক্তি লাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে। অন্যদিকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি যদি ওই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে সংসদে তাঁর আসন শূন্য হবে।

দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে কিংবা দল ছাড়লে সংসদ সদস্যপদ থাকবে না, তা সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর যদি দল তাঁকে বহিষ্কার করে, সে ক্ষেত্রে কী হবে—তা সংবিধানে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা নেই। তবে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হইবে কি না, সে সম্পর্কে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের নিকট প্রেরিত হইবে এবং অনুরূপ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হইবে।’

আগে কি এমন নজির ছিল? দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও সংসদ সদস্য পদে বহাল থাকার নজির রয়েছে। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার–দলীয় জোট সরকারের আমলে অষ্টম জাতীয় সংসদে বিএনপি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন আবু হেনা। তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল বিএনপি। তখন আবু হেনার সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন তৎকালীন স্পিকার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার। এমন ঘটনা এরপর আরও ঘটেছিল। তবে আবু হেনার ঘটনাটি ঘটে ২০০৮ সালের আগে। ওই বছর নির্বাচনী আইন বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে। রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের নিয়মও হয় তখন থেকে।

দশম সংসদে এ ধরনের একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে। তখন বিতর্ক তৈরি হলেও তার সুরাহা হয়নি। বিতর্কিত মন্তব্য করার জেরে ২০১৪ সালে তখনকার সংসদ সদস্য লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল আওয়ামী লীগ। তাঁর প্রাথমিক সদস্যপদও বাতিল করা হয়েছিল। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্যপদ থাকবে কি না? কারণ, তিনি আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দল থেকে বহিষ্কারের পর লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্যপদ বাতিলের সুপারিশ করে জাতীয় সংসদের স্পিকারকে চিঠি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এর পরিপ্রেক্ষিতে লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) চিঠি দিয়েছিলেন স্পিকার। পরে বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগ ও লতিফ সিদ্দিকীর কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিল নির্বাচন কমিশন।

ইসিকে দেওয়া ব্যাখ্যায় লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্যপদ বাতিলের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিল আওয়ামী লীগ। দলটির তখনকার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সই করা সেই চিঠিতে বলা হয়েছিল, ‘লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন আইনে বলা হয়েছে, প্রার্থী মানে দল কর্তৃক মনোনীত বা স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ব্যক্তি। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীর স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নির্বাচনের আগে ও পরে নেই। দলের সপদ থেকে বহিষ্কার হওয়ায় বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগের কেউ নন। যে কারণে তিনি সংসদ সদস্যপদে থাকার আইনগত অধিকার হারিয়েছেন।’

অন্যদিকে লতিফ সিদ্দিকী ইসিকে চিঠি দিয়ে বলেছিলেন, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি কোনো আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ও দেউলিয়া ঘোষিত হলে, বিদেশি রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করলে, ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত হলে, প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে থাকলে এবং ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর সদস্যপদ শূন্য হতে পারে। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে আনীত অভিযোগ এসবের কোনোটিতেই পড়ে না। যে কারণে নির্বাচন কমিশনের এ বিষয়ে শুনানির এখতিয়ার নেই।

লতিফ সিদ্দিকী তাঁর অবস্থানের পক্ষে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, কোনো সদস্য দল থেকে বহিষ্কৃত হলে তাঁর সদস্যপদ বহাল থাকবে এবং সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগপর্যন্ত তিনি ওই দলের সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন। তবে শেষ পর্যন্ত ইসিকে এই বিতর্কের কোনো সিদ্ধান্ত দিতে হয়নি। নির্ধারিত দিনে শুনানি শুরু হলে লতিফ সিদ্দিকী নির্বাচন কমিশনকে বলেন, তিনি নিজেই পদত্যাগ করবেন। তাই শুনানির আর প্রয়োজন নেই। এরপর নির্বাচন কমিশন দুই সপ্তাহের জন্য এ বিষয়ের সব কার্যক্রম স্থগিত করেন। এরপর ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর লতিফ সিদ্দিকী সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার পর স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দেন। ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর লতিফ সিদ্দিকীর আসনটি শূন্য হওয়ার বিষয়টি সংসদকে অবহিত করেন, তখনকার স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।

গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী ‘নৈতিক স্খলনের’ কথা জানিয়েছে। কিন্তু সংবিধানে সংসদ সদস্য পদে থাকার অযোগ্যতা হিসেবে নৈতিক স্খলনের জন্য ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডের কথা রয়েছে। ফলে দৃশ্যত এটা এই মুহূর্তে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য থাকার ক্ষেত্রে অযোগ্যতা প্রমাণ করে না।

বিষয়টি নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে দল থেকে কেউ বহিষ্কৃত হলে সংসদ সদস্যপদে থাকতে পারার কথা নয়। লতিফ সিদ্দিকীর ঘটনাটির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, দলীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে। দল যদি তাঁকে বহিষ্কার করে, তাহলে তিনি আর দলে থাকেন না। নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পর তাঁর আর স্বতন্ত্র সদস্য হওয়ারও সুযোগ নেই। এই যুক্তি থেকে সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার মনে করেন, জামায়াতের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল বহিষ্কার করায় তাঁর সংসদ সদস্যপদও শূন্য হয়ে যাবে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর