ভারতে পুলিশি সহিংসতার শিকার মানুষদের পাশে দাঁড়াতে এবং আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় শুক্রবার এই দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনে শিক্ষার্থী ও দেশের সাধারণ জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
এক্সে প্রকাশিত ওই পোস্টে বিক্ষোভের স্থানীয় আয়োজকদের উদ্দেশে সিজেপি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, ‘‘পুরো সমাবেশের সামনে শিক্ষার্থীদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো উচ্চস্বরে পড়ে শোনান। কর্মসূচির আইনি অনুমতি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোর সুষ্ঠু সমাধানের জন্য বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও অন্যান্য সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং একসাথে কাজ করতে হবে। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই এই আন্দোলনের মূল শক্তি।’’
এর আগে, সকালে দেশটির অত্যন্ত আলোচিত এই ছাত্র আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এক বার্তায় জানান, তীব্র জ্বর ও তীব্র শরীর ব্যথার কারণে যন্তর মন্তরের মূল বিক্ষোভস্থল থেকে তাকে সাময়িকভাবে কিছু ঘণ্টার জন্য দূরে থাকতে হচ্ছে। অসুস্থতার বিষয়টি জানিয়ে সিজেপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘‘গত কয়েক দিন ধরেই প্রবল জ্বর ও প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করে ব্যথার ওষুধ খেয়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আজ যন্তর মন্তরে আমাকে দেখতে না পেলে সবাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। শরীর পুনর্গঠন ও সুস্থ করতে কয়েক ঘণ্টা বিশ্রামের জরুরি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে আশা করছি সন্ধ্যার মধ্যেই আবারও আন্দোলনের মূল মাঠে লড়াইয়ে ফিরে আসব।’’
সরকারের আলোচনার প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি সিজেপি
এদিকে দেশটির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং অভিযোগ করে বলেছেন, চলমান অচলাবস্থা নিরসনে সরাসরি আলোচনার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে চারবার সিজেপির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জিতেন্দ্র সিং বলেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যেকোনো আলোচনার দরজা সরকারের পক্ষ থেকে সবসময়ই উন্মুক্ত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা চার চারবার তাদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে কথা বলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক উত্তর পাইনি। আন্দোলনকারীরা চাইলে যেকোনো সময় আলোচনার জন্য জে পি নাড্ডার বাসভবন কিংবা কার্যালয়ে সরাসরি চলে আসতে পারেন। আমরা তাদের কথা শুনতে প্রস্তুত।’’
প্রশ্ন ফাঁসকারীদের কড়া শাস্তির হুঁশিয়ারি প্রধানমন্ত্রী মোদির
এর আগে একই দিন সকালে চলমান তীব্র আন্দোলনের মুখে প্রথমবারের মতো প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের কঠোর ও দ্রুততম শাস্তির প্রকাশ্য আশ্বাস দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘‘আমাদের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অপচেষ্টা করা কাউকেই ছেড়ে দেওয়া হবে না কিংবা কোনোপ্রকার রেহাই দেওয়া হবে না। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ পোস্টে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, প্রশ্নফাঁসের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত অপরাধীদের দ্রুত সাজা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি গতিশীল ও বিশেষ দ্রুত বিচার আদালত (ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট) গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক, কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রশাসন ও দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় সমস্ত নির্দেশনা ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর এই বড় ঘোষণার পরপরই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে পদ থেকে বরখাস্ত করার প্রাথমিক দাবিটি নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় সিজেপি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও সরকারের অবস্থানকে কেন্দ্র করে শিক্ষামন্ত্রীকে তড়িঘড়ি খোঁচা দিতে ও সমালোচনা করতে ছাড়েননি সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে।
মোদির আশ্বাসকে ‘ভণ্ডামি’ আখ্যা দিয়ে রাহুলের তীব্র আক্রমণ
অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এই আশ্বাসের কড়া সমালোচনা ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিরোধী দল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি মন্তব্য করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই আসলে দেশের কোটি কোটি তরুণদের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি ও সর্বনাশ করেছেন।
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তাৎক্ষণিক বরখাস্ত ও পদত্যাগ নিশ্চিত করা, গত ২০ জুলাই আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর প্রশাসনিক ও পুলিশি হামলার মর্মান্তিক ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানসহ মোট ৩ দফা সুনির্দিষ্ট দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন কংগ্রেসের এই জ্যেষ্ঠ নেতা।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্যে করে রাহুল গান্ধী সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস ও পঙ্গু করার মূল কারিগর ও প্রধান খলনায়ক আপনি নিজেই। আপনার দীর্ঘ শাসনামলেই গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়ভাবে দখল ও পঙ্গু করে দেওয়ার অবাধ সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আর এই শিক্ষা সংকটের পেছনে থাকা প্রতিটি চিহ্নিত অপরাধীকে আপনি নিজেই প্রশাসনিক সুরক্ষা প্রদান করেছেন।’’
সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগিয়ে রাহুল গান্ধী আরও পরিষ্কার ভাষায় বলেন, দেশের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি অত্যন্ত পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট। ১. বিতর্কিত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত করতে হবে, ২. পুলিশি সহিংসতার শিকার ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে সরকারকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে, এবং ৩. নিরপরাধ আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মম হামলা চালানো পুলিশ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।