ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র 'দ্য হিন্দু'-তে প্রকাশিত স্বহস্তে লেখা এক বিশেষ নিবন্ধে সোনিয়া গান্ধী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দেশের ছাত্রছাত্রীরা মূলত স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও ভেঙে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থার যথাযথ সংস্কারের দাবিই জানিয়ে আসছে।
কংগ্রেসের প্রবীণ এই নেত্রী লিখেছেন, ‘‘শিক্ষার্থীদের এই ন্যায়সঙ্গত সাহসিকতার জবাবে মোদি সরকার চরম কাপুরুষতা এবং উদ্দেশ্যহীন নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছে। সরকার আন্দোলনকারীদের দেশের ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী হিসেবে গুরুত্ব না দিয়ে, উল্টো তাদের জাতির শত্রু হিসেবে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে।’’
সোনিয়া গান্ধী দাবি করেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে থাকা পুলিশ সদস্যদের দ্বারা অহিংস ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর এই ধরনের ‘নিষ্ঠুরতা’ চালানো বিজেপি সরকারের জন্য মোটেই নতুন বা নজিরবিহীন ঘটনা নয়। তিনি অতীতের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘‘২০২০ সালে সিএএ-এনআরসি বিরোধী শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলাকালে যেভাবে সশস্ত্র পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছিল, তা দেশের মানুষের স্পষ্ট মনে আছে। পাশাপাশি ভারতের সম্মান বয়ে আনা নারী কুস্তিগীরদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাগুলোও আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি।’’
কংগ্রেস নেত্রী নিবন্ধে উল্লেখ করেন, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বারবার ফাঁস হওয়া এবং দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার চরম অধঃপতনের প্রতিবাদে সারা ভারতজুড়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রবল গতি লাভ করেছে। বিশেষ করে গত ২০ জুলাই তারিখটিকে তিনি ভারতের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক দিন হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি জানান, ওই দিন দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (সিএপিএফ) নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সহিংসভাবে দমনের অপচেষ্টা চালিয়েছে।
পুলিশের দমনপীড়নের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘অসংখ্য নিরীহ বিক্ষোভকারী এই হামলায় মারাত্মক আহত হয়েছেন। এমনকি আন্দোলন শেষে নিরাপদে ঘরে ফিরতে থাকা সাধারণ শিক্ষার্থীরাও রেহাই পাননি, কারণ পুলিশ নির্বিচারে সবাইকে পিটিয়েছে। দেশবাসী চরম হাহাকার নিয়ে এমন কিছু তরুণের দৃশ্য দেখেছে, যাদের শরীর ক্ষতিকারক পেলেট বা ছররা গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। পেলেট গুলির এই ব্যবহার নিঃসন্দেহে স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রত্যক্ষ অনুমোদনেই করা হয়েছে।’’
তিনি আবেগঘন কণ্ঠে আরও যোগ করেন, ‘‘সেদিনের সেই সহিংস নিপীড়নের ভিডিওগুলো দেশের প্রতিটি সচেতন মানুষের স্মৃতিতে গেঁথে গেছে এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এবার আমাদের উচ্চস্বরে ও স্পষ্টভাবে বলার সময় এসেছে—থামুন! এরা অন্য কেউ নয়, এরা আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই তরুণ প্রজন্ম।’’
সবশেষে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিনষ্ট করার অভিযোগ এনে তিনি বলেন, আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীরাই মূল মোদি সরকারের সমস্ত ভণ্ডামি দেশের মানুষের সামনে উন্মোচিত করে দিয়েছে। বর্তমানে রাজপথে নামা এসব অসন্তুষ্ট শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা একটি পরম নৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।