মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চরম উত্তেজনা যখন পুরো অঞ্চলে এক বিধ্বংসী যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে, ঠিক তখনই ইয়েমেনের রণক্ষেত্রে লেগেছে নতুন উত্তাপ। ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রনাধীন হোদাইদাহ বন্দরনগরীতে এক ব্যাপক ও আকস্মিক হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। হুথি পরিচালিত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলার খবর নিশ্চিত করে সৌদির এমন দুঃসাহসিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও ভয়াবহ জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি জারি করেছে।
রিয়াদের চালানো এই গভীর রাতের অতর্কিত হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। হুথিদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, শুক্রবার গভীর রাতে করা এই সামরিক আঘাত রিয়াদের জন্য চরম ও মারাত্মক পরিণতি নিয়ে আসবে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইয়েমেনি ভূখণ্ডে সৌদির উত্তেজনামূলক এই হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না এবং এর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর সামরিক জবাব দেওয়ার সময় তৈরি হয়ে গেছে।
হোদাইদাহকে বারবার লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে সৌদি সরকার মূলত সামনের দিনগুলোতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পথকেই প্রশস্ত করেছে বলে মনে করছে গোষ্ঠীটি। ইয়েমেনের সংবাদমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, সৌদি বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনি টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো। এছাড়া লোহিত সাগরের কৌশলগত কামারান দ্বীপেও বিমান হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে হামলায় এক সাধারণ নারী মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা নিশ্চিত করেছেন যে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হোদাইদাহ বন্দরের মূল স্থাপনায় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। তবে ইয়েমেনে মোতায়েন থাকা সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট তাৎক্ষণিকভাবে হোদাইদাহ বন্দরে সরাসরি আক্রমণের কথা অস্বীকার করেছে।
উল্লেখ্য, এই হোদাইদাহ বন্দর শহরটি হুথি-নিয়ন্ত্রিত উত্তর ইয়েমেনের লাখ লাখ মানুষের বাঁচা-মরার লাইফলাইন হিসেবে বিবেচিত। কারণ দেশের সিংহভাগ বাণিজ্যিক পণ্য এবং জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা কেবল এই বন্দর দিয়েই পৌঁছায়। সেখানে হামলা চালানো মানে পুরো অঞ্চলের ওপর মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনা।
অন্যদিকে, ইয়েমেনে অবস্থানরত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি সামগ্রিক পরিস্থিতি ও যুদ্ধ উত্তেজনার জন্য সরাসরি হুথি গোষ্ঠীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তিনি লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর হুথিদের হামলাকে সম্পূর্ণ কাপুরুষোচিত ও চরম বেপরোয়া কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আল-মালিকি এক কড়া বার্তায় জানান, ইয়েমেনে নিজেদের অবস্থান ও মিত্রদের নিরাপত্তা রক্ষায় সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট প্রয়োজনীয় সব ধরণের সামরিক ও অপারেশনাল পদক্ষেপ নেওয়া অব্যাহত রাখবে।
তিনি আরও হুমকি দেন যে, হুথিরা যদি লোহিত সাগরে তাদের এমন শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে, তবে আগামীতে তা শক্ত হাতে দমন করা হবে। মূলত কয়েকদিন আগেই লোহিত সাগরে জলপথে ড্রোন এবং মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে কয়েকটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্যবস্তু করে হুথিরা। ওই হামলায় সৌদির অন্তত একটি বিশাল তেলবাহী ট্যাংকার মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হুথিদের সাফ সাফ কথা ছিল, জাহাজগুলো তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত জলপথের অবরোধ অমান্য ও অলিখিত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেছিল বলেই আঘাত হানা হয়েছে।
গত ২০ জুলাই থেকে লোহিত সাগরের এই কৌশলগত নৌপথে নৌ-অবরোধ আরোপ করে রেখেছিল হুথি বাহিনী। সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া এক বিমান হামলার পরপরই তারা এই কঠোর সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যে বিমান হামলার পেছনে সরাসরি সৌদি আরবকে অভিযুক্ত করে আসছিল ইয়েমেনি গোষ্ঠীটি। অবশ্য রিয়াদ-সমর্থিত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল সরকার সানা বিমানবন্দরে চালানো এই বিমান হামলার দায় অকপটে স্বীকার করে নিয়েছে। তাদের স্পষ্ট দাবি ছিল, সানা বিমানবন্দরে একটি ইরানি বিমানের অনুমোদনহীন ও অবৈধ প্রবেশের জের ধরেই সেখানে সামরিক হামলা চালাতে বাধ্য হয়েছিল তারা।
এই প্রেক্ষাপটে হুথিদের শীর্ষ সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, ২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে যে এক অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল এবং তার ভিত্তিতে যে সামান্য হলেও 'উত্তেজনা প্রশমন পর্ব' বজায় ছিল, রিয়াদের এই সাম্প্রতিক অশুভ আগ্রাসী পদক্ষেপের মাধ্যমে সেই ঐতিহাসিক সমঝোতার চূড়ান্ত অবসান ঘটল। এর ফলে ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে পুনরায় এক রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরুর কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক মারাত্মক অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেবে।