পাকিস্তানের অস্থিতিশীল খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে ফের এক ভয়াবহ ও আকস্মিক আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এবার আফগানিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন ট্যাঙ্ক জেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি চেকপোস্টকে লক্ষ্য করে চালানো বিস্ফোরকবোঝাই গাড়ি বোমা হামলায় ১৫ জন নিরাপত্তাকর্মী এবং ১২ জন হামলাকারী নিহত হয়েছেন। শুক্রবার রাতে ঘটে যাওয়া এই রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী হামলার দায় স্বীকার করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সশস্ত্র গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে হামলার বিবরণে জানানো হয়, একদল সশস্ত্র হামলাকারী প্রথমে অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে সীমান্ত সংলগ্ন নিরাপত্তা চেকপোস্টে বলপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা চালায়। সেখানে কর্তব্যরত সেনাসদস্য ও নিরাপত্তা বাহিনীর বাধার মুখে পড়ে তারা ব্যর্থ হয়ে তাদের সঙ্গে থাকা একটি মারাত্মক বিস্ফোরকবোঝাই গাড়ি সরাসরি চেকপোস্টের সীমানা প্রাচীরে সজোরে আঘাত করায়।
বিকট শব্দের এই শক্তিশালী বিস্ফোরণে চেকপোস্টের চারপাশের সীমানা প্রাচীর এবং মূল ভবনের একটি বড় অংশ মুহূর্তে ভেঙে ধসে পড়ে। ধসে পড়া দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে ও বিস্ফোরণের সরাসরি আঘাতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন সেনাসদস্য, ২ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং ১ জন বন কর্মকর্তাসহ সর্বমোট ১৫ জন নিরাপত্তাকর্মী প্রাণ হারান। ঘটনার পরপরই পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা পাল্টা অভিযান পরিচালনা করে এবং সেখান থেকে ১২ জন হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করে। অন্যদিকে টিটিপির পক্ষ থেকে এক বার্তায় দাবি করা হয়েছে যে, তাদের সুপ্রশিক্ষিত চারজন আত্মঘাতী সদস্য সরাসরি এই বিশেষ হামলায় অংশ নিয়েছিল। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সশস্ত্র অভিযান ও হামলা চালিয়ে আসছে টিটিপি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সীমান্তঘেঁষা খাইবার পাখতুনখোয়া এবং পার্শ্ববর্তী বান্নু জেলায় সংগঠনটির এই ধরনের সহিংস হামলার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
নিরাপত্তা সংক্রান্ত গবেষণা সংস্থা 'সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ'-এর দেওয়া চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সহিংসতায় ১ হাজার ৬২০ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন, যা পরবর্তী বছরে আরও বহুগুণ বেড়ে গিয়ে ২ হাজার ৩৩১ জনে পৌঁছায়। পাকিস্তান সরকার শুরু থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করে আসছে যে, টিটিপি আফগানিস্তানের ভূখণ্ডকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল বানিয়ে সেখান থেকেই তাদের ওপর এসকল হামলা পরিচালনা করছে। তবে আফগান তালেবান সরকার সবসময় এই অভিযোগ অস্বীকার করে এটিকে কেবলই পাকিস্তানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সমস্যা বলে দাবি করে আসছে। এই সীমান্ত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বিগত কিছুদিন যাবত দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সম্প্রতি পাকিস্তান সীমান্তবর্তী একাধিক আফগান এলাকায় একাধিকবার যুদ্ধবিমান দিয়ে হামলা চালিয়েছিল, যার জবাবে আফগান সামরিক বাহিনীও সীমান্ত পার হয়ে পাল্টা গুলিবর্ষণ করে। জাতিসংঘের প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, দুই দেশের এই সীমান্তবর্তী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জেরে চলতি বছরেই শত শত নিরীহ আফগান বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।