ভারতের সাম্প্রতিক শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টিকারী এবং শিক্ষার্থী ও তরুণদের প্রবল আন্দোলনের মুখে অবশেষে নতিস্বীকার করে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার বহুল আলোচিত প্রশ্নপত্র ফাঁসের সার্বিক দায় ও নীতিগত দায়বদ্ধতা নিজের কাঁধে নিয়ে তিনি পদত্যাগ করেছেন। উল্লেখ্য, তাঁর এই পদত্যাগের সুনির্দিষ্ট দাবিতেই গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে দিন-রাত অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ ও আন্দোলন অব্যাহত রেখেছিলেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
ভারতের সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই ঐতিহাসিক আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে দেশের তরুণদের ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। এই আলোচিত রাজনৈতিক ও আন্দোলনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন অভিজিৎ দীপকে, যিনি একসময় যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ও অধ্যয়নরত ছিলেন। পরবর্তীতে নিজ দেশের শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার এবং শিক্ষা ব্যবস্থার চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে যুক্তরাষ্ট্রে পড়ালেখা ছেড়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরেই তিনি শিক্ষার্থীদের এক ছাতার নিচে সুসংগঠিত করেন এবং দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সরাসরি দেশটির শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করার মতো এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
মূলত ভারতের সমস্ত তরুণ সমাজ ও ছাত্রসমাজ নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ভুলে গিয়ে এক ও অভিন্ন ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ফলেই শাসকগোষ্ঠীকে এমন নতিস্বীকার করাতে সম্ভব হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এই অভূতপূর্ব বিজয়ের পর ককরোচ জনতা পার্টির প্রধান অভিজিৎ দীপকে ভারত ও পুরো বিশ্বকে উদ্দেশ্য করে ঐক্যের শক্তির মূল বিষয়টি প্রকাশ্যে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যদি তাঁদের দেশের সাধারণ মানুষ ও তরুণ সমাজ ধর্মীয় বিভাজনের ফাঁদে না পড়ে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ এক থাকে এবং মৌলিক অধিকার ও বাস্তব ইস্যুগুলো নিয়ে সোচ্চার হয়ে আন্দোলন গড়ে তোলে, তবে বর্তমানের চেয়েও আরও অনেক বড় বড় ক্ষমতার সিংহাসনেও বড় রকমের কাঁপন ধরে যাবে।
অভিজিৎ দীপকে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে তাঁর নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, “যদি কোনো সমাজে হিন্দু-মুসলিমভিত্তিক বিভাজন বা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি না থাকে এবং রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু শুধু দেশ ও জনগণের উন্নয়ন এবং প্রকৃত ইস্যুভিত্তিক হয়, তখন যেকোনো শক্তিশালী ও বড় বড় সিংহাসনও কাঁপতে বাধ্য হবে। আমাদের মূল শক্তি হলো জাতীয় ঐক্য। যখন আমরা এই সংকীর্ণ হিন্দু-মুসলিম রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে সক্ষম হব এবং নিজেদের নাগরিক অধিকার, শিক্ষার মান ও মৌলিক ইস্যুগুলো নিয়ে কথা বলব, তখনই তা প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশ ও ভবিষ্যতের জন্য সর্বাঙ্গীন মঙ্গল ও কল্যাণ বয়ে আনবে।”
অপরদিকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারকে সরাসরি বার্তা দিয়ে কঠোর সুরে অভিজিৎ দীপকে মন্তব্য করেছেন। ক্ষমতাসীন জোট ও তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “বহুদিন ধরে দেশে একটি কথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল যে, বর্তমান এই মোদি সরকারে কারও পদত্যাগের কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বা ঐতিহ্য নেই। কিন্তু প্রবাদ আছে— দুনিয়া ঠিকই বিজয়ী ও সত্যের কাছে মাথা নত করে। তবে তার জন্য শাসকের মাথা নত করানোর মতো যোগ্য ও অনড় মানুষ থাকা চাই।” নিজের বক্তব্যে এই প্রবাদটি ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি মূলত তাঁর দল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং রাজপথে অনড় অবস্থানে থাকা লাখ লাখ তরুণ বিক্ষোভকারীর অসাধারণ ধৈর্য, সহনশীলতা ও ইস্পাতকঠিন প্রতিজ্ঞার গভীরতাকে পুরো দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
উল্লেখ্য, ভারতে চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভের জন্য অন্যতম প্রধান, বড় এবং অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হলো মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা, যা সংক্ষেপে ‘নিট’ (NEET) নামে পরিচিত। এই একটিমাত্র কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে দেশের লাখ লাখ সম্ভাবনাময় তরুণের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ জীবন শুরু হয়। কিন্তু সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা জনসমক্ষে আসার পর পুরো দেশের তরুণেরা চরম ক্ষোভে ফেটে পড়েন। শিক্ষাব্যবস্থার এমন ভয়াবহ বিপর্যয় ও দুর্নীতির জন্য ছাত্রসমাজ সরাসরি ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নৈতিক ও প্রশাসনিক পদত্যাগ দাবি করে রাস্তায় নেমে আসেন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ লড়াই ও সংগ্রামের পর অবশেষে শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা আদায়ের মাধ্যমে তরুণদের এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের মূল ও প্রাথমিক দাবি বাস্তবায়িত হলো।