ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

খেজুর চাষে ভাগ্য বদল মোতালেবের


  • আপলোড সময় : শনিবার ২৫ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৮:০১ পিএম

সাজ্জাদুল আলম খান, ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি:

বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সময় সাধারণত মানুষ স্যুটকেস ভর্তি করে নানা জিনিসপত্র নিয়ে আসেন। আব্দুল মোতালেব এনেছিলেন খেজুরের বীজ। সেই বীজই একসময় তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে, তা হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি। বরং দেশে ফিরে খেজুরের বীজ রোপণ করায় গ্রামের মানুষের হাসিঠাট্টার শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। কেউ কেউ তাঁকে পাগল’ও বলতেন।


দুই দশকের বেশি সময় পর সেই মোতালেবই এখন এলাকায় পরিচিত খেজুর মোতালেব নামে। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার পাড়াগাঁও গ্রামের এই উদ্যোক্তার বাগানে এখন প্রায় ১০০টি গাছে খেজুর ধরছে। তাঁর দাবি, মাত্র কয়েকটি গাছ থেকে উৎপাদিত চারা এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। চারা ও খেজুর বিক্রি করে বছরে কোটি টাকার ব্যবসা করছেন বলেও দাবি তাঁর।

আব্দুল মোতালেব (৫৪) উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের পাড়াগাঁও গ্রামের মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় দুই দশক আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে একটি খেজুরবাগানে মাসিক ১০ হাজার টাকা বেতনে কাজ নেন। তিন বছর ওই বাগানে কাজ করার সময় খেজুর গাছের পরিচর্যা, পরাগায়ন ও চাষাবাদের নানা বিষয় হাতে-কলমে শেখেন। দেশে ফেরার সময় সঙ্গে করে নিয়ে আসেন খেজুরের বীজ।

দেশে ফিরে বাড়ির পাশের জমিতে বীজ রোপণ করেন মোতালেব। প্রথম দফায় ২৭৫টি চারা গজালেও পরে দেখা যায়, অধিকাংশ গাছই পুরুষ। ফলে গাছে মুকুল এলেও খেজুর ধরেনি। হতাশ না হয়ে আবারও চারা রোপণ করেন তিনি। দ্বিতীয় দফাতেও একই অভিজ্ঞতা হয়।

মোতালেব জানান, তৃতীয় দফায় কয়েকটি গাছের মধ্যে দুটি গাছে খেজুর ধরলে তাঁর দীর্ঘদিনের চেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখে। সেই দুটি গাছ থেকেই পরে চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন তিনি।

তাঁর দাবি, ওই দুটি গাছ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০টি চারা উৎপাদন করেছেন। বর্তমানে তাঁর বাগানে প্রায় ১০০টি গাছে খেজুর ধরেছে। চলতি বছর প্রায় ৫ লাখ টাকার খেজুর বিক্রি করেছেন। চারা ও খেজুর মিলিয়ে বছরে কোটি টাকার ব্যবসা করছেন বলেও দাবি তাঁর।

মোতালেব বলেন, লোকে বিদেশে গেলে স্যুটকেস ভর্তি জিনিস নিয়ে আসে। আর আমি আনছিলাম খেজুর। দেশের মানুষ হাসাহাসি করত, পাগল বলত।

মোতালেবের খেজুরবাগানের গল্পে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে একটি গাছ। তাঁর ভাষ্য, বীজ থেকে গজানো ১১টি গাছের মধ্যে একটি গাছে প্রথম স্ত্রী মুকুল আসে। গাছটি আলাদা করে সংরক্ষণ করেন তিনি। পরে এর নাম দেন ‘শাইখ সিরাজ’।

মোতালেবের দাবি, এটি বাংলাদেশে প্রথম সৌদি খেজুর গাছ। তাঁর বাগানে থাকা এই গাছ থেকেই পরবর্তী সময়ে চারা উৎপাদনের কাজ এগিয়ে নেন তিনি।

প্রথম দিকে গাছের লিঙ্গ শনাক্ত করতে না পারায় বারবার ব্যর্থ হতে হয়েছে জানিয়ে মোতালেব বলেন, প্রায় ১৭ মাস পর প্রথম একটি গাছে মুকুল এসেছিল। কিন্তু সেটি পুরুষ মুকুল হওয়ায় ফলন হয়নি। কয়েক বছর ধরে একের পর এক গাছে মুকুল এলেও সেগুলো পুরুষ হওয়ায় খেজুর পাওয়া যায়নি। পরে স্ত্রী গাছ শনাক্ত হওয়ার পর তাঁর চাষাবাদে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়।

মোতালেব বর্তমানে স্ত্রী গাছ থেকে চারা উৎপাদনে কাটিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন বলে জানান। তাঁর দাবি, এ পদ্ধতিতে স্ত্রী গাছ থেকে উৎপাদিত চারা স্ত্রী গাছ হয়। পাশাপাশি পুরুষ গাছে কাটিং সংযোজন করেও চাষ করছেন তিনি।

নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অন্যদেরও খেজুর চাষে আগ্রহী করে তুলছেন মোতালেব। তাঁর দাবি, ইতিমধ্যে কয়েক শ মানুষ তাঁর কাছ থেকে চারা নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খেজুরের বাগান করেছেন। তবে এসব বাগানের সংখ্যা বা উৎপাদনের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

সরকারি সহযোগিতা পেলে আরও বড় পরিসরে চারা উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। কম দামে কৃষকদের মধ্যে চারা ছড়িয়ে দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খেজুর চাষ বাড়াতে চান তিনি।

বাংলাদেশের আবহাওয়া ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত খেজুর শুকিয়ে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বড় বাধা বলে মনে করেন মোতালেব। এ কারণে বর্তমানে তিনি মূলত কাঁচা খেজুর বিক্রি করছেন।

তাঁর ভাষ্য, গাছ থেকে পাকা খেজুর সংগ্রহের পর শুকাতে প্রায় ৬ থেকে ৭ দিন সময় লাগে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে শুকানো ও সংরক্ষণে সমস্যা হয়। তাই উৎপাদিত খেজুরের বড় অংশ কাঁচা অবস্থায় বাজারজাত করেন তিনি।

একসময় সৌদি আরব থেকে খেজুরের বীজ নিয়ে ফেরায় যাঁকে গ্রামের মানুষ নিয়ে হাসাহাসি করেছিল, সেই মোতালেবের বাগান এখন তাঁর স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। কয়েকটি গাছ দিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ আজ চারা উৎপাদন ও খেজুর বিক্রির ব্যবসায় রূপ নিয়েছে।

তবে খেজুর চাষকে আরও বড় পরিসরে নিতে প্রয়োজন উন্নত জাত, বৈজ্ঞানিক পরিচর্যা, পরাগায়ন ও সংরক্ষণ প্রযুক্তির সহায়তা। এসব সুবিধা পাওয়া গেলে বাংলাদেশে খেজুর চাষ বাণিজ্যিকভাবে আরও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন এই উদ্যোক্তা।



এ সম্পর্কিত আরো খবর