ইউরোপের দুই দেশ ফ্রান্স ও স্পেনে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ দাবানল। তীব্র তাপপ্রবাহ এবং প্রবল বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত গতিতে লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ায় তা নিয়ন্ত্রণে আনতে চরম বেগ পেতে হচ্ছে দমকলকর্মীদের। অনিয়ন্ত্রিত এই আগুনের কারণে ইতোমধ্যেই উভয় দেশ মিলিয়ে তিন লাখেরও বেশি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। উদ্ভূত ভয়াবহ পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে সেনা মোতায়েন, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে জরুরি অবস্থা জারি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ সহায়তা নেওয়াসহ নানা জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে অনবরত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। তবে প্রচণ্ড বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত দেশটির ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ বোর্দো শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দেশটির উদ্ধারকারী দলের একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, আগুনের যে ভয়াবহ তীব্রতা, তাতে এটি এখনো নিয়ন্ত্রণে আনার কাছাকাছি পর্যায়েও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
মূলত ঝোড়ো বাতাস ও রেকর্ড পরিমাণ উচ্চ তাপমাত্রা আগুন নেভানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্পেনে ইতিমধ্যেই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে রাজধানী মাদ্রিদের আশপাশের এলাকার আবহাওয়ায় সাময়িক কিছুটা পরিবর্তন আসায় সেখানে দমকলকর্মীরা কাজ করার কিছুটা সুবিধা পাচ্ছেন। সংকটময় এই মুহূর্তে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দেশবাসীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও কঠিন ও আশঙ্কাজনক হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চলের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দাবানলে অন্তত একজনের প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, নিহত ব্যক্তির বয়স ৭০ বছরের বেশি। মানিসেস এলাকার সাল্ট দে ল’আইগুয়া গিরিখাত এলাকায় অগ্নিকাণ্ড নেভানোর কাজ করার সময় একটি বিধ্বস্ত গাড়ির ভেতর থেকে ওই বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার করেন দমকলকর্মীরা।
অন্যদিকে ফ্রান্সে শনিবার রাতেও আরও ৫৫ হাজার মানুষকে দ্রুত এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এর ফলে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা জিরোন্দ ও লঁদ থেকে সরিয়ে নেওয়া মোট মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় আড়াই লাখে। ফরাসি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন নিকোলা ব্রাজ আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, আগুনের তীব্রতা এতটাই প্রলয়ংকারী যে তা নিজের ভেতরের তাপে নিজস্ব বাতাস ও ঘূর্ণিবাতাস তৈরি করছে। এর ফলে আগুনের গতিপথ ঘনঘন পরিবর্তিত হচ্ছে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা অসাধ্য হয়ে পড়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, উদ্ধারকর্মীদের জন্য আরও একটি ভয়াবহ ও কঠিন রাত অপেক্ষা করছে।
দাবানলের এই অভূতপূর্ব দুর্যোগ মোকাবিলায় ফরাসি সরকার সেনাবাহিনীকে মাঠে নামিয়েছে। সেনা সদস্যরা বনাঞ্চলের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে এবং আগুন ছড়ানো বন্ধ করতে 'ফায়ারব্রেক' বা অগ্নি-নিরোধক নালা তৈরি করে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সার্বিক সহায়তা দিচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, দাবানল থামলে ক্ষতিগ্রস্ত সব পরিকাঠামো আবার নতুন করে গড়ে তোলা হবে এবং দুর্যোগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকার পুরোপুরি জনগণের পাশে থাকবে।
দেশজুড়ে অন্তত ৩০টি পৃথক স্থানে সক্রিয় দাবানল জ্বলতে থাকায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জরুরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডেকেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের ইতিহাসে এমন নজিরবিহীন ও ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি এর আগে কখনোই দেখা যায়নি।
একইভাবে স্পেনের মাদ্রিদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে দাবানল তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা সাংবাদিকদের জানান, আবহাওয়ার প্রতিকূলতার কারণে তাদের উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দাবানল শুরুর পর থেকে মাদ্রিদ ও আভিলা অঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং আরও ২৮ হাজার মানুষকে নিরাপত্তার স্বার্থে নিজ গৃহে অবরুদ্ধ থাকতে হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত স্পেনে ১ লাখ ৩০ হাজার হেক্টরের বেশি ভূখণ্ড পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অথচ বিগত এক দশকে দেশটিতে বাৎসরিক পুড়ে যাওয়া জমির গড় পরিমাণ ছিল ১ লাখ হেক্টর। পাশাপাশি ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, চলতি বছরে ফ্রান্সেও ৯৮ হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি ও লোকালয় আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে।