কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর সরকারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন ভারতের লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন যে, সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের দমনকারী বর্তমান এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সময় এখন চলে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হালনাগাদ তথ্যটি নিশ্চিত করা হয়েছে। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ভারতের বর্তমান ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়ায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এর পাশাপাশি দেশজুড়ে টানা আন্দোলন ও লড়াইয়ে অংশ নেওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই অভূতপূর্ব বিজয়ের জন্য আন্তরিক অভিনন্দন জানান তিনি।
তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরও আন্দোলনকারীদের মূল দাবির কয়েকটি এখনো বাকি রয়েছে উল্লেখ করে রাহুল গান্ধী আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের দুটি প্রধান দাবি এখনো পূরণ করা হয়নি। প্রথমত, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী এবং দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজপথে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর যে বর্বর সহিংসতা চালানো হয়েছে, তার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করে উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে রাহুল গান্ধী বলেন, শিক্ষার্থীরা ছাড়াও সমাজের অন্যান্য অবহেলিত অংশ যেমন—কৃষক, শ্রমিক এবং দরিদ্র সাধারণ মানুষকে এই সরকার প্রতিনিয়ত শোষণ ও দমন করে আসছে। তাই দেশের আপামর জনতার উদ্দেশ্যে তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এখন সময় এসেছে সংবিধানসম্মত উপায়ে পূর্ণ সাহস নিয়ে নিজেদের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষার করার। এই সরকারকে উৎখাত করার এখনই উপযুক্ত সময়। আন্দোলনের উদ্দেশ্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো ধরনের ভয় পাবেন না।
উল্লেখ্য, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা টানা প্রবল শিক্ষার্থী আন্দোলনের মুখে পড়ে নতিস্বীকার করে শনিবার পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। মূলত বিভিন্ন সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার নানাবিধ গুরুতর অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছিল এই ছাত্র ক্ষোভ। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগই ছিল অন্যতম প্রধান দাবি।
নিজের পদত্যাগপত্রে ভারতের সদ্য সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান উল্লেখ করেন, দেশের সার্বিক ঐক্য ও শৃঙ্খলা অটুট রাখা, শিক্ষার্থীদের সম্ভাব্য আইনি জটিলতা থেকে দূরে রাখা এবং তাদের ভবিষ্যৎ ও পড়াশোনার বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করেই তিনি স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর এই কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
এর আগে গত শুক্রবার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির প্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। উক্ত বৈঠকের পর আন্দোলনকারী সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে সরকারের তরফ থেকে একদিনের সময় চাওয়া হয়েছিল।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের খবর সামনে আসার পরপরই ঐতিহাসিক যন্তর-মন্তরের বিশাল সমাবেশে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তকে বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে অভিজিৎ দিপকে বলেন, প্রধান বিচারপতি যদি আদালত কক্ষে আমাদের কটাক্ষ করে ‘তেলাপোকা’ না বলতেন, তবে হয়তো এই ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের জন্মই হতো না।
স্মরণযোগ্য যে, গত মে মাসে একটি মামলার শুনানিকালে দেশটির প্রধান বিচারপতির করা একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামক এই ব্যতিক্রমী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল। পরবর্তীতে সেই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে প্রধান বিচারপতি জানিয়েছিলেন যে, উক্ত মন্তব্যটি দেশের বেকার তরুণ সমাজের উদ্দেশ্যে করা হয়নি; বরং ভুয়া আইনের ডিগ্রিধারী ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে করা হয়েছিল। তবে ততদিনে মন্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থীদের চলমান অধিকার আদায়ের আন্দোলনের মূল প্রতীকে পরিণত হয়।