উত্তর ইরাকের কুর্দিস্তান স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ‘খোর মোর’ গ্যাসক্ষেত্রে একটি মারাত্মক ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যে এই হামলাটি ওই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নতুন করে বড় ধরনের আঘাত হানল। কারণ, এই নির্দিষ্ট গ্যাসক্ষেত্রটি থেকেই উত্তর ইরাকের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলের প্রায় অধিকাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ফলে এই গ্যাসক্ষেত্রে হামলার ঘটনায় পুরো অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, উত্তর ইরাকের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলের সুলাইমানিয়া জেলায় অবস্থিত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওই খোর মোর গ্যাসক্ষেত্রে সোমবার দিবাগত শেষ রাতের দিকে এই ড্রোন হামলা চালানো হয়।
ঠিক একই সময়ে, ওই হামলাস্থল থেকে প্রায় দুইশত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কুর্দি শাসিত অঞ্চলের রাজধানী শহর এরবিলেও একের পর এক বিকট বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। মধ্যরাতের সেই বিস্ফোরণের মুহূর্তের কিছু আতঙ্কজনক ভিডিওচিত্র ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরাকি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ফার্সের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন কনস্যুলেটের নিকটবর্তী সংবেদনশীল এলাকাসহ উত্তর ইরাকের এরবিলের বিভিন্ন পয়েন্টে অন্তত সাতটি বিকট বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার সঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় পুলিশ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, উত্তর ইরাকের এরবিলের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত খালিফান ও সোরান এলাকার বিভিন্ন কৌশলগত স্থানকে লক্ষ্য করে অন্তত চারটি ইরানি ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, ইরানি ড্রোনের এই সন্দেহভাজন ও আচমকা হামলার জবাব দিতে এবং আকাশসীমা সুরক্ষায় এরবিলের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের ১০টিরও বেশি সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান ও সামরিক ড্রোন অবিরাম মহড়া দিতে ও উড়তে দেখা গেছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলায় লক্ষ্যবস্তু করা এলাকাগুলো ও তার আশপাশের অঞ্চলে ভয়াবহ ও অনিয়ন্ত্রিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে জানা গেছে, হামলা চালাতে আসা দুটি ড্রোন মূল লক্ষ্যবস্তুর খুব কাছাকাছি এসে যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কারণে বিধ্বস্ত হয়।
উল্লেখ্য যে, সংঘাতের নতুন ধাপে টানা ১৩ রাত তীব্র বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর গত শুক্রবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে তাদের সামরিক হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের পক্ষ থেকে হামলা স্থগিত করায় পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরানও মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু সেই যুদ্ধবিরতি বা নীরবতার আবহ বজায় থাকার মধ্যেই আচমকা উত্তর ইরাকে খোর মোর গ্যাসক্ষেত্র ও এরবিলে এসব নতুন ড্রোন হামলার খবর প্রকাশ্যে এল।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়েছে যে, মার্কিন সামরিক বাহিনীতে পর্যাপ্ত অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি তৈরি হওয়ার কারণেই এই হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ধরনের দাবি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেছেন, অস্ত্রঘাটতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর বিশেষ অনুরোধ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কারণেই তিনি ইরানে হামলা আপাতত স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান রাজ্যে যাওয়ার পথে সোমবার ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিশেষ উড়োজাহাজ এয়ার ফোর্স ওয়ানে সফররত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ইতিবাচক বার্তা দেন। তিনি বলেন, “বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যথেষ্ট ভালো ও গঠনমূলক আলোচনা চলছে। দুই দেশের এই আলোচনার মধ্য দিয়ে খুব শীঘ্রই ভালো কিছু ঘটার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।”
আমেরিকার প্রেসিডেন্টের এমন আশাব্যঞ্জক মন্তব্যের পরপরই উত্তর ইরাকে গ্যাসক্ষেত্র ও মার্কিন কনস্যুলেটের কাছে এই ড্রোন হামলার ঘটনা পুরো মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে আবারও নতুন করে অনিশ্চয়তা ও সামরিক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।