ভারতের উত্তর সীমান্ত সংলগ্ন কৌশলগত এলাকাগুলোতে পঞ্চম প্রজন্মের অত্যন্ত শক্তিশালী ও অত্যাধুনিক ‘জে-২০ মাইটি ড্রাগন’ স্টিলথ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে চীন। দিল্লির সঙ্গে বিদ্যমান সীমান্ত উত্তেজনার মধ্যেই ওই অঞ্চলে অত্যাধুনিক এই যুদ্ধবিমানের সংখ্যা বাড়ানোসহ সামরিক মহড়া বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে বেইজিং। কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে সংগৃহীত সাম্প্রতিক কিছু গোপনীয় ছবিতে দেখা গেছে যে, চলতি ২০২৬ সালের জুন ও জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের মুখোমুখি অবস্থানরত দুটি চীনা বিমানঘাঁটিতে অন্তত ১১টি জে-২০ স্টিলথ বিমান মোতায়েন করা হয়েছে।
মহাকাশভিত্তিক উপাত্ত ও তথ্য বিশ্লেষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থ ‘ভ্যান্টর’-এর নেওয়া কৃত্রিম উপগ্রহের দূরবর্তী ছবির বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, গত ৯ জুলাই শিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ হোটান বিমানঘাঁটির রানওয়েতে অন্তত সাতটি জে-২০ স্টিলথ বিমান সুবিন্যস্তভাবে সারিবদ্ধ অবস্থায় রাখা ছিল। কৌশলগত সামরিক ও বেসামরিক—দুই ধরনের ব্যবহারের উপযোগী এই স্পর্শকাতর বিমানঘাঁটিটি লাদাখের উত্তরে ভারতীয় বিমানবাহিনীর দৌলত বেগ ওল্ডি ঘাঁটি থেকে মাত্র ২৪৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এবং লেহ থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৩৮৯ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। মহাকাশচিত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী, ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন কোনো চীনা বিমানঘাঁটিতে একই সঙ্গে এত বিপুল পরিমাণে পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ বিমানের সক্রিয় উপস্থিতি এর আগে কখনো লক্ষ্য করা যায়নি।
একই সংবাদের দ্বিতীয় আরেকটি উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, তিব্বতের লাসা প্রশাসনিক এলাকার অন্তর্গত দামশুং বিমানঘাঁটির প্রধান রানওয়েতে আরও চারটি জে-২০ স্টিলথ যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চীন নিয়ন্ত্রিত এই ঘাঁটিটি অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং এলাকা থেকে মাত্র ৩৪৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।
উদ্যোগী মহাকাশ ও সামরিক প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'নিউস্পেস'-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক যুদ্ধবিমান চালক সমীর জোশী এই সামরিক মোতায়েন সম্পর্কে বলেন, হোটান ঘাঁটিতে সাতটি এবং দামশুং ঘাঁটিতে চারটি জে-২০ ফাইটার জেট মোতায়েনের ঘটনা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ভারতের মুখোমুখি অত্যন্ত উঁচুতে অবস্থিত সীমান্তঘাঁটিগুলো থেকে পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ বিমান চালনা করা চীনের বিমানবাহিনীর জন্য এখন একটি স্বাভাবিক দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়েছে। এটি কেবল ভারতকে কোনো শক্তি প্রদর্শন বা সতর্কবার্তা পাঠানো নয়, বরং এটি ভারতীয় বিমানবাহিনীর সুরক্ষার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী হুমকি।
চীনা জে-২০ স্টিলথ যুদ্ধবিমানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অতিসূক্ষ্ম রাডার প্রযুক্তি এবং রাডার ফাঁকি দেওয়ার অসামান্য দক্ষতা। এই বিমানের বিশেষ গঠনগত নকশার কারণে শত্রুপক্ষের রাডারে এটি সহজে ধরা পড়ে না। ফলে স্বাভাবিক বা প্রথাগত যেকোনো যুদ্ধবিমানের তুলনায় এটি যুদ্ধক্ষেত্রে বহুগুণ এগিয়ে থাকে। ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিমান বহরে বর্তমানে থাকা ফরাসি প্রযুক্তির 'রাফাল' বিমান অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও সেটি কিন্তু পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ ঘরানার বিমান নয়।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ভারতের নিজেদের কাছে বর্তমানে কোনো নিজস্ব স্টিলথ ফাইটার বা রাডার ফাঁকি দেওয়ার মতো যুদ্ধবিমান নেই। নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি দেশের প্রথম স্টিলথ বিমান ‘এডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট’ (এএমসিএ) নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়া হলেও সেটি চূড়ান্তভাবে বিমানবাহিনীতে যুক্ত হতে অন্তত ২০৩৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।
সামরিক বিষয়ের আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'দ্য ওয়ার জোন'-এর তথ্যমতে, ২০১৯ সালে চীনের কাছে ৫০টির মতো জে-২০ বিমান ছিল, যা ২০২২ সালের শেষে ২০০টি ছাড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ করার ফলে চীন বছরে প্রায় ১২০টি পর্যন্ত জে-২০ ফাইটার জেট তৈরি করতে সক্ষম হয়। বর্তমান ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীনের সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় এক ডজন সক্রিয় ইউনিটে বর্তমানে ৩০০ থেকে ৫০০টিরও বেশি জে-২০ স্টিলথ যুদ্ধবিমান পুরোদমে কর্মরত রয়েছে। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত গবেষণা সংস্থা 'রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট' দাবি করেছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের বিমান বহরে জে-২০ বিমানের সংখ্যা এক হাজারে গিয়ে পৌঁছাবে।
ভারতের সাবেক বিমানবাহিনী উপ-প্রধান এয়ার মার্শাল নরমদেশ্বর তিওয়ারি এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রতি বছর চীনের প্রায় একশ পঁচিশটির মতো সামরিক বিমান বানানোর সক্ষমতা তাদের বিশাল সামরিক-শিল্প ব্যবস্থার অসামান্য সামর্থ্যকে উন্মোচিত করে। একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল থাকার কারণেই তারা এত বিপুল গতিতে যুদ্ধবিমান তৈরি করতে পারছে।
ভারত সীমান্তে এই ধরনের বিমান মোতায়েন একদম নতুন কিছু নয়। এর আগে ২০১৬ সালে তিব্বতের অত্যন্ত উঁচুতে অবস্থিত দাওচেং ইয়াদিং বিমানবন্দরে প্রথম জে-২০ বিমান দেখা গিয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের মে মাসে সিকিম সীমান্তের কাছে শিগাতসে ঘাঁটিতেও এই যুদ্ধবিমানগুলো দেখা যায়।
চীনা সামরিক শক্তির অগ্রগতির জবাবে ভারত বর্তমানে হরিয়ানা ও পশ্চিমবঙ্গের দুটি স্কোয়াড্রনে মোট ৩৬টি রাফাল বিমান পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য আরও ২৬টি রাফাল বিমান আমদানির চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং বিমানবাহিনীর জন্য নতুন করে ১১৪টি অতিরিক্ত রাফাল কেনার আলোচনা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ভারতীয় বিমানবাহিনী এর পাশাপাশি রাশিয়ার তৈরি ২৬০টির বেশি 'সুখই-৩০ এমকেআই' বিমান পরিচালনা করছে, যেগুলো নিয়মিত আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। তবে সীমান্তে সম্প্রতি চীনের স্টিলথ বিমান মোতায়েন সম্পর্কিত কোনো প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয়নি ভারতীয় বিমানবাহিনী।