ব্রাজিলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে প্রকাশ্যে 'চোর' বলে তীব্র কটূক্তি করেছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। দুই দেশের শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে এই নজিরবিহীন কাদা ছোড়াছুড়ি ও চরম মানহানিকর মন্তব্যের জের ধরে আর্জেন্টিনা থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে অবিলম্বে স্থায়ীভাবে ফিরিয়ে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ঘটনার শুরু গত রোববার, যখন ব্রাজিলের অর্থনৈতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত সাও পাওলো শহরে যুক্তরাষ্ট্রপন্থি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোর সমর্থনে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনি প্রচারণায় সরাসরি অংশ নেন আর্জেন্টিনার কট্টর ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। সেই জনসভায় দাঁড়িয়ে ব্রাজিলের বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানকে উদ্দেশ্য করে 'চোর' এবং 'সাজাপ্রাপ্ত আসামি' বলে বিস্ফোরক সব মন্তব্য করেন তিনি। যদিও নিজের বক্তব্যের সময় সরাসরি লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নাম মুখে উচ্চারণ করেননি মিলেই, তবে তাঁর ইঙ্গিত যে কার দিকে ছিল, তা বুঝতে কারও বাকি থাকেনি।
এমন অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া হতে সময় নেয়নি। এর তীব্র জের ধরে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আয়ার্স থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয় ব্রাজিল সরকার। ব্রাজিল সরকারের তরফ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের এই ধরনের কুরুচিকর ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য ব্রাজিলের সার্বভৌম সরকার, জনগণ ও তাঁদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে চরমভাবে অপমান ও অবমূল্যায়ন করেছে।
পরবর্তী এক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, দেশের যেকোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে অন্য কোনো দেশের অযাচিত নাক গলানো বা হস্তক্ষেপ কোনো অবস্থাতেই বরদাস্ত করা হবে না। বহিরাগত রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই তিনি অত্যন্ত স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা করে যাবেন বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
উদ্ভূত কূটনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত হুলিও বিতেলির সোমবারের মধ্যেই নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করার কথা রয়েছে।
রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্রাজিলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বহুল আলোচিত দুর্নীতি, ঘুষগ্রহণ ও আর্থিক কেলেঙ্কারির নানা মামলায় জড়িয়ে ২০১৮ সালে আদালতে ১২ বছরের দীর্ঘ কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। তবে সেই সাজা ঘোষণার পর ১৮ মাসের কিছু বেশি সময় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটানোর পরেই আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি পান তিনি।
পরবর্তীতে ২০২১ সালে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ সুপ্রিম কোর্ট তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া পূর্বের সেই বিতর্কিত সাজা সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করেন। এই আইনি জয়ের ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন উগ্র ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারোকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে পরাজিত করে শতকরা ৫০ দশমিক ৯ ভাগ ভোট পেয়ে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেন এবং পুনরায় ব্রাজিলের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় আসনে অধিষ্ঠিত হন লুলা। কিন্তু এত বছর পর প্রতিবেশী দেশের প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্যে লাতিন আমেরিকার এই দু’টি শক্তিশালী রাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হলো।