কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালির পূর্ণ একক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ইয়েমেনের সশস্ত্র হুতি বিদ্রোহীরা। ইরান যেভাবে পারস্য উপসাগরের মূল বাণিজ্যিক পথ নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক একই ছকে হুতিরাও এই বিশ্ব বাণিজ্যের পথটি অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করছে। সোমবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এক জরুরি বার্তায় এই গুরুতর অভিযোগ এনেছেন ইয়েমেন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরাহ আল-জৌবা।
সংবাদ সম্মেলনে আফরাহ আল-জৌবা প্রকাশ করেন যে, হুতি বিদ্রোহীরা সরাসরি ইরানের গ্রহণ করা হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হুবহু অনুসরণ করতে চাইছে। যদি সশস্ত্র এই গোষ্ঠী তাদের পরিকল্পনায় সফল হয়, তবে হরমুজ এবং বাব আল-মান্দেব—বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর এই দুটি আন্তর্জাতিক প্রধান নৌপথই একযোগে চরম ঝুঁকির মুখে পতিত হবে। তিনি আরও আক্ষেপ করে বলেন, লোহিত সাগরে হুতিদের অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অত্যন্ত দুর্বল ও অকার্যকর প্রতিক্রিয়াই মূলত বিদ্রোহী এই গোষ্ঠীকে এমন দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নিতে আরও বেশি উৎসাহিত ও সাহসী করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মানচিত্রে বাব আল-মান্দেব প্রণালি অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থান দখল করে আছে। এই কৃত্রিম পথটি মূলত লোহিত সাগরকে সরাসরি এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সমগ্র বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ বিশাল কনটেইনার পরিবহন এবং ১২ থেকে ১৫ শতাংশ সার্বিক বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রতিদিন এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যবহার করে পরিচালিত হয়ে থাকে। কিন্তু হুতিদের সাম্প্রতিক ধারাবাহিক হামলার ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে সাধারণ বাণিজ্য জাহাজের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে নেমে এসেছে। সম্প্রতি প্রাপ্ত সামুদ্রিক তথ্যে দেখা গেছে যে, গত রোববার মাত্র ১১টি পণ্যবাহী জাহাজ কোনোমতে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ অতিক্রম করতে পেরেছে।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় চলতি জুলাই মাসের শুরুর দিকেই হুতি বিদ্রোহীরা প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরবগামী এবং সৌদি আরব থেকে ছেড়ে আসা কিংবা প্রবেশ করা সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর একতরফা সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয়। শুধু নৌপথ অবরুদ্ধ করাই নয়, তারা সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে একাধিক প্রাণঘাতী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলাও চালায়।
হুতিদের সেই হামলার কড়া জবাবে সৌদি বিমান বাহিনী ইয়েমেনের হুতি-নিয়ন্ত্রিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত বন্দরনগরী হোদেইদাতে ব্যাপক বিমান হামলা পরিচালনা করে এবং তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরাহ আল-জৌবা স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, বর্তমান ইয়েমেন সরকার যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলার জন্য সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। তিনি সার্বিক পরিস্থিতি সামনে এনে নিশ্চিত করেন যে, বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকা এবং হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকার সংযোগ সীমান্তে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি ও সামরিক উত্তেজনা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকেই নতুন করে বড় আকারের পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু করা হয়নি।
রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিগত ২০১৪ সালে হুতি বিদ্রোহীরা হঠাৎ আক্রমণ চালিয়ে ইয়েমেনের রাজধানী সানায়া সম্পূর্ণ দখল করে নিলে দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও হুতিরা আজও ইয়েমেনের রাজধানী সানায়াসহ দেশের এক বিশাল কৌশলগত ভূখণ্ড নিজেদের শক্ত নিয়ন্ত্রণে ধরে রেখেছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আল-জাজিরার বিশেষ সংবাদে মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সামরিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনার তথ্য বিশদে তুলে ধরা হয়েছে।