ইউরোপজুড়ে প্রাকৃতিক দাবানলের সংখ্যা আশঙ্কাজনক ও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে তীব্র সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। আন্তর্জাতিক এই স্বাস্থ্য সংস্থাটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, বিগত ২০২২ সালের পর থেকে ইউরোপ অঞ্চলে প্রাকৃতিক দাবানলের সার্বিক ঘটনা শতকরা ৫৭ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে আগামী দিনগুলোতে এই দাবানল আরও ঘন ঘন ও বহুগুণ বেশি ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে বলেও চরম আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ডব্লিউএইচও।
চলতি গ্রীষ্মকালে ইউরোপের একের পর এক শক্তিশালী ও উন্নত দেশ ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, স্পেন এবং পর্তুগালে একাধিক বড় ধরনের ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আগুনে ইতিমধ্যেই বহু বনাঞ্চল ও জনপদ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে ফ্রান্স ও ইতালিতে আগুন নেভানোর চরম বিপজ্জনক মুহূর্তে কয়েকজন উদ্ধারকারী দমকলকর্মীর করুণ মৃত্যু ঘটেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের ২২ জুলাই পর্যন্ত পুরো ইউরোপজুড়ে ১ হাজার ২৫৪টি বড় আকারের ধ্বংসাত্মক দাবানল শনাক্ত করা হয়েছে। এসব নিয়ন্ত্রণহীন আগুন থেকে ইতিমধ্যেই প্রায় ৮৩ লাখ ১০ হাজার টনেরও বেশি মারাত্মক ক্ষতিকর কার্বন ডাইঅক্সাইড বিষাক্ত ধোঁয়া হিসেবে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছে, যা সার্বিক পরিবেশ সুরক্ষার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পর্তুগাল ও স্পেনে চলতি বছরের একই সময়ের তুলনায় দাবানল ঘটার মোট সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে গিয়ে পৌঁছেছে। এদিকে ইউরোপীয় বন দাবানল তথ্য ব্যবস্থা (ইএফএফআইএস) জানিয়েছে, কেবল গত বছরেই প্রায় ২২ লাখ হেক্টর সবুজ বনাঞ্চল ও জমি দাবানলে পুরে ছাই হয়ে যায়। অন্যদিকে চলতি বছরের ২২ জুলাই পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ইতোমধ্যে প্রায় ২ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর এলাকা আগুনে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফ্রান্সে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যে সেখানকার জলন্ত দাবানল লোকালয় ও প্রধান শহরগুলোর একদম সীমানার কাছে চলে এসেছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্য চরম মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে।
উদ্ভূত এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপ অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হান্স হেনরি পি. ক্লুগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের অশুভ প্রভাবে সমগ্র পৃথিবী দিন দিন আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। তাই বিশ্বের দেশগুলোকে ভবিষ্যতে অত্যন্ত ঘন ঘন এবং অভূতপূর্ব ভয়াবহ দাবানল মোকাবিলা করার জন্য এখনই মানসিকভাবে ও সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
আঞ্চলিক পরিচালক হান্স হেনরি পি. ক্লুগে আরও বলেন, এই জাতীয় দাবানলের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি কিন্তু শুধু সরাসরি আগুনে পুড়ে যাওয়া বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এসব আগুনের বিষাক্ত ও ক্ষতিকর ধোঁয়া বাতাসের মাধ্যমে শত শত কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বিস্তীর্ণ এলাকার বায়ুদূষণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পায়। বিষাক্ত এই বাতাস মানবের হৃদ্রোগ, তীব্র শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের জটিলতা এবং মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে থাকে। বিশেষ করে ছোট শিশু, প্রবীণ ও বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকেই বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এই বিষাক্ত বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি শারীরিক ঝুঁকিতে পড়েন।
সামগ্রিক এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের সব সরকারগুলোর প্রতি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে। ডব্লিউএইচও স্পষ্টভাবে বলেছে, যেকোনো দাবানল সৃষ্টি হওয়া মাত্রই দ্রুততম সময়ে আবহাওয়া, বাতাসের চরম তাপমাত্রা ও বায়ুর সার্বিক মানের পরিবর্তন সম্পর্কে স্থানীয় জনগণকে স্পষ্ট ও সরাসরি সতর্কবার্তা প্রদান করতে হবে।
এর পাশাপাশি সংস্থাটির পরামর্শ হলো, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনে যেকোনো ধরনের দূরবর্তী ভ্রমণ সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে হবে। অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজনে বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে যদি মানুষকে ঘরের বাইরে যেতেই হয়, তবে অবশ্যই যথাযথ সুরক্ষামূলক এন-৯৫ বা মানসম্মত মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছে আন্তর্জাতিক এই প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বজুড়ে এই দাবানল ও কার্বন নিঃসরণ বন্ধে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে মহাদেশটির স্বাস্থ্য ঝুঁকি আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।