বিশ্বের অন্যতম প্রধান দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নতুন করে জোরালো হয়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে রেকর্ড পরিমাণ ও বড় ধরনের পতন ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা অবশেষে প্রশমিত হতে পারে—এমন ইতিবাচক প্রত্যাশায় মাত্র এক দিনের ব্যবধানে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম শতকরা ১০ ভাগের বেশি কমেছে বলে নিশ্চিত করেছে তুর্কি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আনাদোলু।
সোমবার বাংলাদেশ সময় মধ্যরাত ১২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজার মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের বাজারমূল্য প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৮৮ দশমিক ৬ মার্কিন ডলারে নেমে আসে। এর আগের কর্মদিবসে যা প্রতি ব্যারেল ৯১ দশমিক ৬৮ ডলারে বিক্রি হয়েছিল, অর্থাৎ সেই হিসাব থেকে তেলের দর এক ধাক্কায় শতকরা ১০ দশমিক ৪ ভাগ হ্রাস পেয়েছে।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের অপর বিশ্বস্ত চালিকাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে একদিনে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৮২ দশমিক ৩৫ ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের এসব মূল পথ থেকে বিশ্ব বাজারে তেলের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ বা ব্যাহত হতে পারে—এমন তীব্র সামাজিক ও কূটনৈতিক উদ্বেগের মুখে গত সপ্তাহেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সাময়িকভাবে আকাশচুম্বী হয়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ মার্কিন ডলারে গিয়ে পৌঁছেছিল। তবে দীর্ঘ প্রায় দুই সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের পর গত শুক্রবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পূর্বঘোষিত সমস্ত সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করার বড় ঘোষণা দিলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অবশেষে স্বস্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করে।
পরবর্তীতে সোমবার এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরানের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে ‘অত্যন্ত ভালো ও ইতিবাচক আলোচনা’ চলমান রয়েছে এবং খুব দ্রুত একটি সুনির্দিষ্ট স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে এই সংলাপ প্রক্রিয়া কোনো কারণে চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানের ওপর আবারও কঠোর সামরিক হামলা শুরু করা হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক বার্তা দিয়ে রাখেন।
এর বিপরীতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের তরফ থেকেও জানানো হয়েছে যে, তারাও বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের পাল্টা সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে। এর পাশাপাশি কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার স্বার্থে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ওমানের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তারা ইতিবাচক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে মধ্য এশিয়ার দেশ কাজাখস্তানের তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগর উপকূলে অবস্থিত ক্যাস্পিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়াম টার্মিনাল থেকে সাময়িক বিরতির পর আবারও পুরোদমে অপরিশোধিত তেল পরিবহন শুরু হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ কাঠামোর পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দরপতনে প্রভাব ফেলেছে।
তবে জ্বালানি বাজারে এমন স্বস্তির হাওয়া বইলেও বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিনের শঙ্কা ও সতর্কতা কিন্তু পুরোপুরি কেটে যায়নি। কারণ ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হঠাৎ দাবি করেছে যে, তারা প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংস্থা সৌদি আরামকো-সংশ্লিষ্ট জিজান ও ইয়ানবুতে অবস্থিত কয়েকটি স্পর্শকাতর তেল স্থাপনায় সফল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের তোলা ওই দাবির কোনো আনুষ্ঠানিক সত্যতা এখন পর্যন্ত সৌদি সরকার বা তাদের তেল সংস্থা সৌদি আরামকো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।