ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২ কমলা হ্যারিসের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা, পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার রাজধানীতে সকালের বৃষ্টিতে সড়কে ভোগান্তি, ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস

বহুচর্চিত নুসরাত হত্যা মামলা:

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির ডেথ রেফারেন্স শুনানি আজ


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ২৮ জুলাই, ২০২৬ সময় : ১২:১৯ পিএম

সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করা ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আপিল আবেদনের ওপর চূড়ান্ত শুনানি আজ মঙ্গলবার হাইকোর্টে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। উচ্চ আদালতের নির্ধারিত বিচারিক কার্যতালিকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মামলাটি অন্তর্ভূক্ত থাকায় যেকোনো সময় বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চে এটি শুনানির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত হবে।

দেশের বিচারিক ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস ও বর্বর হিসেবে বিবেচিত এই মামলার পেপারবুক তৈরি এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়াদি অনেক আগেই সম্পন্ন করা হয়েছিল। সম্প্রতি গত ১০ জুন নারী ও শিশু ধর্ষণ এবং নৃশংস নির্যাতন ও হত্যা সংক্রান্ত আলোচিত মামলাগুলোর ডেথ রেফারেন্স দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তির তাগিদ তৈরি হয়। মামলার বিচারিক জট কমানো ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দেন। প্রধান বিচারপতির বিশেষ নির্দেশের ধারাবাহিকতাতেই দেশের কোটি মানুষের নজরকাড়া নুসরাত হত্যা মামলাটি আজ চূড়ান্ত শুনানির জন্য হাইকোর্টের বেঞ্চে যুক্ত করা হয়েছে।

ফেনী জেলা ও উচ্চ আদালতের নথিপত্র এবং মামলার বিবরণী সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ। সেদিন ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ-দৌলা তাঁর নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন হয়রানি করেন। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার ভিত্তিতে পুলিশ সিরাজ উদ-দৌলাকে দ্রুত গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়।

পরবর্তী সময়ে কারাগারে বসেই মামলাটি প্রত্যাহার করার জন্য নুসরাত ও তাঁর পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে নিজ অনুসারী ও সহযোগীদের নির্দেশ দেন অধ্যক্ষ সিরাজ। কিন্তু নুসরাত ও তাঁর পরিবার অন্যায়ের কাছে নতিস্বীকার না করে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আসামিরা নুসরাতকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত ও নৃশংস নীলক নকশা প্রস্তুত করে।

নীলনকশা অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষার দিন পরীক্ষা কেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নেওয়া হয় নুসরাতকে। সেখানে তাকে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে সরাসরি আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনে শরীরের ৮৫ শতাংশের বেশি মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়া সত্ত্বেও অসীম সাহসী নুসরাত ঢামেক হাসপাতালের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন থেকে ঢাকাতেই নিজের জবানবন্দি প্রদান করে। চিকিৎসকদের দীর্ঘ চার দিনের আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে একই বছরের ১০ এপ্রিল রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বীরকন্যা নুসরাত মৃত্যুবরণ করেন।

এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর সারাদেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভের জোয়ার ওঠে। তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ১৬ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে চার্জশিট দাখিল করে। ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশীদ দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর এক ঐতিহাসিক ও দৃষ্টান্তমূলক রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ অভিযুক্ত সব ১৬ আসামির প্রতিটির অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের প্রত্যেককেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা প্রদান করারও নির্দেশ দেওয়া হয়।

রায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ওই ১৬ আসামি হলেন— সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ-দৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন কাউন্সিলর মাকসুদ আলম (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা পপি (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) এবং মোহাম্মদ শামীম (২০)।

ট্রাইব্যুনালের এই ঐতিহাসিক রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য আইনের স্বাভাবিক নিয়ম অনুস্বারে ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর মামলার যাবতীয় নথি ও ডেথ রেফারেন্স ট্রাইব্যুনাল থেকে সরাসরি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধি ও আইনি নিয়ম অনুযায়ী, নিম্ন বা বিচারিক আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করলে সেই রায় চূড়ান্তভাবে কার্যকর করার আগে হাইকোর্টের অনুমোদন পাওয়া বাধ্যতামূলক। এ কারণেই আইন অনুযায়ী যেকোনো মৃত্যুদণ্ডের রায় সংশ্লিষ্ট ডেথ রেফারেন্স হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চ আদালতে আসে।

বিচারিক আদালতের ওই রায়ের বিরুদ্ধে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে এবং খালাস চেয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা পৃথকভাবে জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল দায়ের করেছিলেন। নিয়মানুযায়ী হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে রাষ্ট্রপক্ষের দায়ের করা ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিপক্ষের জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল আবেদনের ওপর একই সঙ্গে আজ যৌথ ও সমান্তরাল শুনানি শুরু হচ্ছে। পেপারবুকের প্রতিটি পাতা পর্যালোচনা ও উভয় পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ সওয়াল-জবাব শেষে হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের সাজা বহাল রাখবেন, পরিবর্তন করবেন নাকি আসামিদের খালাস দেবেন—সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। দেশব্যাপী বহুল চর্চিত এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম ঘিরে আজ দিনভর উচ্চ আদালত চত্বরে ব্যাপক কৌতুহল ও আগ্রহ বিরাজ করছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর