ঢাকা টুডে ডেস্ক
চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া প্রতিরক্ষা ও উদ্ভাবনবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলনে শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের নিয়ে উপস্থিত হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সে সময় পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। সম্মেলন মঞ্চ থেকে ট্রাম্পের মূল বার্তাটি ছিল একেবারেই স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য আরও বেশি অস্ত্র ও গোলাবারুদ তৈরি করতে হবে এবং সেই কাজের গতি বহুগুণ বাড়াতে হবে। ইউএস আর্মি ওয়ার কলেজে সমবেত বিশ্বখ্যাত অস্ত্রনির্মাতাদের উদ্দেশে ট্রাম্প তখন বলেন, বিশ্বের মধ্যে মার্কিন অস্ত্রের গুণগত মান সবচেয়ে সেরা হলেও বর্তমানে উৎপাদন ও সরবরাহের গতি আরেকটু বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন মূলত এই আয়োজনকে দ্বিমুখী কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে—যার একদিকে রয়েছে দেশের শিল্প খাতের পুনরুজ্জীবন এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও যুদ্ধ–সক্ষমতা জোরদার করা। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ভাষায়, এই যুদ্ধ–সক্ষমতাই হলো দেশটির স্বাধীনতার প্রধান রক্ষাকবচ। তবে জমকালো এই আয়োজনের অন্তরালে মার্কিন নীতিপ্রণেতাদের গভীর উদ্বেগের একটি বড় বিষয় ঢাকা পড়ে গেছে। সেটি হলো অত্যাধুনিক ও জটিল প্রযুক্তির বিপুল পরিমাণ মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের আশঙ্কাজনক হ্রাস।
চলতি বছরের শুরুর দিকে 'অপারেশন এপিক ফিউরি' চলাকালে ইরানে টানা প্রায় ৪০ দিনের জোরালো সামরিক অভিযান এবং পরবর্তী পাল্টাপাল্টি হামলায় অভাবনীয় পরিমাণ উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। মার্কিন সরকারের সরকারি তথ্যানুযায়ী, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত আনুমানিক ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে, যার সিংহভাগই খরচ করা হয়েছে দামি গোলাবারুদ, দূরপাল্লার মিসাইল এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পেছনে।
গত ৮ এপ্রিল তেহরানের সঙ্গে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রতি ইরানে আকাশ হামলা স্থগিতের ঘোষণা কার্যকর হওয়ার আগপর্যন্ত মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানজুড়ে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনাসমূহ রক্ষায় তাদের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ১,৭০০-এর বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করেছে। ট্রাম্পের দাবি, আলোচনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা আপাতত স্থগিত রেখেছে। তবে প্রভাবশালী বিদেশি সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন করে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রাগার বিপজ্জনকভাবে খালি হয়ে পড়তে পারে—এমন সামরিক সতর্কবার্তার কারণেই মূলত হামলা স্থগিত রাখা হয়েছে।
অবশ্য গত সোমবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অস্ত্রাগারের এমন ঘাটতির তথ্য সরাসরি অস্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, বিশ্বজুড়ে যেকোনো দেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনেক বেশি গোলাবারুদ জমা আছে, যা এমনকি তাদের চাহিদার চেয়েও বেশি। পেন্টাগন ও প্রশাসনের ভেতরে এই বিষয়টি বেশ কিছুদিন ধরেই একটি সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। শুরুতে পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ অস্ত্র ঘাটতির কথা অস্বীকার করলেও সম্প্রতি মার্কিন সিনেটের অর্থ বরাদ্দ কমিটিকে তিনি জানিয়েছেন যে, চরম জরুরি সামরিক ঘাটতি মেটাতে পেন্টাগনের অবিলম্বে আরও ৮,৭০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত বাজেট প্রয়োজন।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক কী পরিমাণ গোলাবারুদ খরচ হয়েছে বা বর্তমানে কী পরিমাণ জমা আছে সেই সুনির্দিষ্ট তথ্যগুলো রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার অংশ, তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) পর্যবেক্ষণ এক চিন্তার চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মার্ক কানসিয়ান ব্যাখ্যা করে বলেন, একটি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায় এবং এই জটিল উৎপাদন প্রক্রিয়া রাতারাতি দ্রুত বাড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বর্তমানে পেন্টাগন যে সরবরাহ পাচ্ছে তা মূলত ২০২৩ সালে বরাদ্দ দেওয়া অর্থের ফসল।
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইল (টিএলএএম)। সাধারণত যুদ্ধজাহাজ বা সাবমেরিন থেকে ছোড়া এই ক্ষেপণাস্ত্র ১,৬০০ কিলোমিটার দূরের সুরক্ষিত কমান্ড বাংকার ও সামরিক ঘাঁটিতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে। সিএসআইএসের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ১,০০০-এর বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ২০৩১ সালের আগে মার্কিন বাহিনীর এই ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত যুদ্ধ–পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সর্বাধুনিক প্রতিটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে খরচ হয় প্রায় ২৬ লাখ ডলার।
অন্যদিকে, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র রুখতে প্যাট্রিয়ট ও থাড নামের উন্নত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করতে গিয়ে চড়া মূল্য চোকাতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে। যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ২,৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র জমা থাকলেও ইতিমধ্যে প্রায় ১,৪৩০টি ব্যবহার করা হয়ে গেছে। একেকটি প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য প্রায় ৪০ লাখ ডলার, যা দিয়ে ইরানের তৈরি মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলারের সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হচ্ছে। অতি-উঁচুতে আঘাত হানতে সক্ষম ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্রেরও সিংহভাগ ব্যবহৃত হয়ে গেছে, যার বর্তমানে সচল ৯টি ব্যাটারির মধ্যে ৭টিই যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব।
ইরানের সঙ্গে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এমন একসময়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যাকে সামরিক বিশ্লেষকেরা ‘ডেভিডসন উইন্ডো’ বলে থাকেন। মার্কিন কৌশলবিদদের মতে, এই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে চীনের সেনাবাহিনী যেকোনো সময় তাইওয়ান আক্রমণ করতে পারে। সিআইএ-র সাবেক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চীন ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান নিয়ন্ত্রণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাবে। এমন অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্রাগার খালি হয়ে যাওয়ায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন যদি বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ও উন্নত ড্রোন-ঝাঁক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবে মার্কিন বাহিনী বড় ধরনের অপ্রস্তুত পরিস্থিতি ও অস্ত্র সংকটের মুখে পড়তে পারে।
ইরান যুদ্ধের পর ইউক্রেন সংকটও নতুন মোড় নিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পেন্টাগনের এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহারের ফলে ইউরোপে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার গতি ও সক্ষমতা থমকে যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাসে সর্বোচ্চ ৬০-৬৫টি এবং বছরে ৭০০-৮০০টি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হয়, অথচ অপারেশনের প্রথম দিনেই মার্কিনীরা ৮০৩টি ক্ষেপণাস্ত্র খরচ করে ফেলেছে।
তবে এ বিশাল সংকটের মধ্যেও মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক ও হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধি অ্যানা কেলি দাবি করেছেন, শত্রুপক্ষকে চরম বার্তা দিতেই এই অস্ত্রের ব্যবহার জরুরি ছিল। তদুপরি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র কমলেও ইরানের সামরিক উৎপাদন কাঠামো ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানের নিজস্ব অস্ত্র তৈরির সীমাবদ্ধতা এখন পেন্টাগনের চেয়েও অনেক বেশি শোচনীয় অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে।
(সূত্র: বিবিসি)