ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২ কমলা হ্যারিসের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা, পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার রাজধানীতে সকালের বৃষ্টিতে সড়কে ভোগান্তি, ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস

উদ্যোগের আড়ালে সংকট: সুন্দরবনে জলবায়ু, দস্যু ও খাদ্য ঝুঁকিতে বাঘ


  • আপলোড সময় : বুধবার ২৯ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৫:০৩ পিএম

বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষে সুন্দরবনে কৃত্রিম পুকুর খনন, বাঘের আশ্রয়ের জন্য উঁচু কেল্লা নির্মাণ কিংবা আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারির নানা সাফল্যের দাবি করছে বন বিভাগ। তবে কর্তৃপক্ষের এসব আশাব্যাঞ্জক দাবির বিপরীতে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। গবেষক, সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় বাসিন্দা এবং সরাসরি বনজীবীদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি ও বন বিভাগের ঘোষিত পরিকল্পনার মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়ে গেছে। দিন দিন বাড়তে থাকা লোনা পানি, তীব্র খাদ্য সংকট এবং বনদস্যু ও চোরাশিকারিদের গোপন তৎপরতায় সুন্দরবনের বাঘ এখন চতুর্মুখী অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র ক্ষতিকর প্রভাবে বদলে যাচ্ছে সুন্দরবনের সার্বিক প্রাকৃতিক পরিবেশ। দ্রুত বাড়ছে লোনা পানির পরিমাণ, দেখা দিচ্ছে নদীভাঙন, আর পলি জমে ভরাট হচ্ছে ভেতরের ছোট-বড় খাল ও নদী। একের পর এক আঘাত হানা প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সুন্দরবনের ভৌগোলিক আয়তনকে আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত করছে। একই সঙ্গে লোনা পানির প্রভাবে মিঠাপানির তীব্র সংকটে কেবল উদ্ভিদ নয়, ব্যাহত হচ্ছে পুরো বনের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র। হরিণসহ অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় খাদ্যশৃঙ্খলে বড় ধস নেমেছে, যার সরাসরি করুণ মাশুল গুনতে হচ্ছে বনের প্রধান ও মূল শিকারি প্রাণী বাঘকে।

শ্যামনগরের গাবুরা এলাকার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ বনজীবী নুর ইসলাম তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “ছোটবেলা থেকে বনে কাজ করতে যাচ্ছি। আগে বনের কিনারায় ভিড়লেই হরিণের দল চোখে পড়ত, বাঘের আনাগোনা দেখা যেত। এখন সেই দিন আর নেই। পুরো বন যেন নিস্তব্ধ ও প্রাণহীন হয়ে পড়ছে।”

অন্যদিকে, সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েও কাজ করছে গভীর সংশয়। হরিনগর এলাকার জেলে আকবর আলীর ভাষ্য, “নদীতে মাছ বা কাঁকড়া ধরতে গেলে শুধু প্রাকৃতিক ঝড়-তুফানের ভয় নয়, মানুষের তৈরি আতঙ্কও কম নয়। বনের গভীরে দস্যুদের আনাগোনা এখনো বিদ্যমান। সুযোগ পেলেই জেলেদের আটকে চাঁদা আদায় করা হয়। সেই সঙ্গে বন্যপ্রাণী শিকারের খবরও আমরা পাই। মানুষই যেখানে নিরাপদ নয়, সেখানে বাঘ কীভাবে নিরাপদে থাকবে?”

স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, বনদস্যু ও সংগঠিত চোরাশিকারি চক্র বনের ভেতরে এখনো সমানভাবে সক্রিয়। ২০০০ সালের দিকে সুন্দরবনে যেখানে বাঘের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০টি, দস্যু ও শিকারিদের তাণ্ডবে তা কমতে কমতে একপর্যায়ে ১০০-র কোঠায় নেমে আসে। বনজীবীদের দাবি, প্রতিটি বাঘ শিকার করে ভারতে সীমান্ত পার করতে পারলে তা অন্তত ৭ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। ফলে দস্যু ও আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের মূল নিশানা থাকে সুন্দরবনের বাঘ।

গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ভৌগোলিক আয়তন না থাকায় বাঘের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। সাধারণত একটি পূর্ণাঙ্গ বাঘের মুক্তভাবে বিচরণের জন্য গড়ে ১৪ থেকে ১৬ বর্গকিলোমিটার এলাকার প্রয়োজন হয়। কিন্তু বনাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ও খাদ্যসংকট তীব্র হওয়ায় পেটের তাগিদে বাঘ প্রায়ই লোকালয়সংলগ্ন এলাকায় চলে আসছে। এতে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে মানুষ-বাঘের প্রাণঘাতী সংঘাত।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে শুধু সাতক্ষীরা উপকূলেই বন্যপ্রাণীর হামলায় ১৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৬৮ জনই মারা গেছেন বাঘের আক্রমণে। নিহতদের প্রায় ৬০ শতাংশই ছিলেন মৌয়াল (মধু সংগ্রাহক), ২২ শতাংশ বাউয়াল (কাঠ সংগ্রাহক) এবং ১৮ শতাংশ জেলে।

জাতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিশনের সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম মনিরুল এইচ খান মনে করেন, বাঘ সংরক্ষণকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সুন্দরবনের শীর্ষ শিকারি হিসেবে বাঘের বেঁচে থাকা পুরো বনের খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করে। লবণাক্ততা, মিঠাপানির তীব্র অভাব এবং শিকারি প্রাণীর সংখ্যা হ্রাস—সবগুলো একসাথে বাঘের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে। এর সাথে বননির্ভর মানুষের জীবিকার সংকট যুক্ত হয়ে বিষয়টি আরও জটিল করে তুলেছে। তাই বাঘ রক্ষায় বাস্তুতাত্ত্বিক ও সামাজিক সমন্বিত পদক্ষেপে যেতে হবে।

সাতক্ষীরার নাগরিক নেতা মাধব দত্ত জানান, উপকূলীয় মানুষের বিকল্প আয়ের উপায় সীমিত হওয়ায় বাধ্য হয়েই তারা কাঠ, মাছ, মধু বা কাঁকড়া সংগ্রহ করতে বনে যান। বননির্ভরতা না কমালে বনের ওপর চাপ কমবে না। পাশাপাশি বনের ভেতরে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত না করা গেলে অবৈধ শিকার ও দস্যুতা থামানো অসম্ভব।

বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুন্দরবনে অন্তত ৬২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। বাঘ হত্যা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের অভিযোগে এ সময়ে ১৯টি মামলা হলেও রায় হয়েছে ১০টির, আর প্রমাণের অভাবে আসামিরা খালাস পেয়েছে ৬টি মামলায়।

তবে বিদ্যমান সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দাবি জানিয়ে বুড়োগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা সুলজ কুমার দ্বীপ বলেন, “মিঠাপানির সংকট দূর করতে আমরা বনের ভেতরে কৃত্রিম পুকুর খনন করছি। প্রযুক্তির ব্যবহারে নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে। আমাদের এসব তৎপরতা ও অভিযানের বলেই বাঘের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ১২৫টিতে পৌঁছেছে।”


এ সম্পর্কিত আরো খবর