মধ্যপ্রাচ্যের স্পর্শকাতর হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত তেল সরবরাহে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎস হিসেবে এশিয়ার শীর্ষ দেশগুলো এখন কানাডার ‘ট্রান্স মাউন্টেন পাইপলাইন’ (টিএমএক্স) থেকে জ্বালানি তেল আমদানির দিকে ঝুঁকছে। আন্তর্জাতিক শিপিং ও তেল ট্র্যাকিং সংস্থা কেপলারের উদ্ধৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আল জাজিরা এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) প্রকাশিত কেপলারের সর্বশেষ তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের পর আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যে এই প্রথম বিশ্বখ্যাত এক্সন মোবাইলের ভাড়া করা একটি তেলবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে কানাডিয়ান অপরিশোধিত তেলের প্রথম আন্তর্জাতিক চালানটি জাপানের উদ্দেশ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে রওনা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক শিপিং ট্র্যাকিং সংস্থা কেপলার জানিয়েছে, মার্শাল আইল্যান্ডসের জাতীয় পতাকাবাহী ‘ফ্রিডম গ্লোরি’ নামের একটি বিশাল সুপারট্যাংকার বা জাহাজ কানাডার ভ্যাঙ্কুভার বন্দর থেকে বুধবার রাতে সরাসরি যাত্রা শুরু করে। বিপুল সক্ষমতার এই জাহাজটি প্রায় সাড়ে সাত লাখ ব্যারেল টিএমএক্স ক্রুড তেল বহনে সক্ষম। মেগা চালানের এই বিশেষ কানাডিয়ান তেলটি সরাসরি ক্রয় করেছে জাপানের সর্ববৃহৎ খনিজ তেল শোধনাগার কোম্পানি এনইওএস।
চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনার মুখে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অনিয়ন্ত্রিত দাম বৃদ্ধির কারণে বৃহস্পতিবার টোকিও তাদের চলতি বছরের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বনির্ধারিত পূর্বাভাস ১ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে ০ দশমিক ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য যে, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সামরিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপান তাদের জাতীয় চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি অপরিশোধিত খনিজ তেল ওই হরমুজ প্রণালি পথ দিয়েই বিরামহীনভাবে আমদানি করত। কিন্তু দুই পরাশক্তির প্রত্যক্ষ সংঘাতের কারণে ওই আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষা করতে বিকল্প উৎস হিসেবে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ কানাডাসহ নতুন নতুন বিশ্বস্থ সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বৈচিত্র্যময় উপায়ে তেল সংগ্রহের জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিশাল এই ট্রান্স মাউন্টেন পাইপলাইনটি বা টিএমএক্স দৈনিক ৮ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল কানাডার অ্যালবার্টা অঞ্চল থেকে দ্রুততম সময়ে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বার্নাবি মেরিন টার্মিনালে পরিবহন করে নিয়ে আসে। কানাডা সরকারের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই কৌশলগত তেলের পাইপলাইনটি ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিক থেকে শুরু করে বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হয়ে আসছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরে ভ্যাঙ্কুভার বন্দর থেকে রফতানি হওয়া মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৭৭ শতাংশই একচেটিয়াভাবে গেছে এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে, যা ২০২৪ সালে ছিল মাত্র ৫১ শতাংশের কাছাকাছি।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালির সংকটের পর এশিয়ার বাণিজ্যিক পরাশক্তি ভারত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর আবার নতুন করে কানাডার টিএমএক্সের ক্রুড তেল কেনা বাড়িয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অফিসিয়াল শক্তি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ) আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশই সরাসরি আসে প্রতিবেশী রাষ্ট্র কানাডা থেকে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন কানাডিয়ান আন্তর্জাতিক পণ্যের ওপর অতিরিক্ত চড়া শুল্ক আরোপ করা সত্ত্বেও কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ওয়াশিংটনের সাথে চলমান দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সুকৌশলে তেল সরবরাহ বন্ধ করবেন না বা বাণিজ্যিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন না বলে আন্তর্জাতিক মহলে স্পষ্ট ও বার্তা দিয়েছেন।