ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

চট্টগ্রামে ভয়াবহ গ্যাস সংকট: নিভেছে চুলা, কমেছে উৎপাদন, বেড়েছে লোডশেডিং


  • আপলোড সময় : সোমবার ০৩ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৬:৩৫ পিএম

চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। নগরীর আবাসিক এলাকায় সিংহভাগ সময় চুলায় আগুন জ্বলছে না, রান্না বন্ধ থাকায় বাসাবাড়িতে তৈরি হয়েছে চরম দুর্ভোগ। অন্যদিকে গ্যাসের অভাবে উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমিয়ে দিয়েছে শিল্প-কারখানাগুলো। সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও জ্বালানি পাচ্ছেন না চালকেরা। পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাবে চট্টগ্রামজুড়ে বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের জোড়া ধাক্কায় দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের জনজীবন, পরিবহন খাত, শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাসের দৈনিক স্বাভাবিক চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সংকটের প্রথমে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছিল মাত্র ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। কিন্তু আগস্টের শুরু থেকে এই সরবরাহ আরও কমে গেছে, যার ফলে আবাসিক ও শিল্প—উভয় খাতেই হাহাকার তৈরি হয়েছে।

সংকটের ফলে নগরীর হালিশহর, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, চকবাজার, বাকলিয়া, পতেঙ্গাসহ অধিকাংশ এলাকায় ভোরের পর থেকেই গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমে আসছে। গৃহিণীরা দুপুরের খাবার রান্না করছেন বিকেলে কিংবা গভীর রাতে, আবার অনেকেই বাধ্য হয়ে প্রতিদিন রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভর করছেন। একই চিত্র দেখা গেছে সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় স্টেশনগুলোর সামনে অটোরিকশা ও মাইক্রোবাসের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।

আসকার দিঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা ইশরাত জাহান জানান, এক সপ্তাহ ধরে তাঁদের পরিবারে খাবারের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। সকালে গ্যাস চলে যাওয়ায় দুপুরে রান্না করা যায় না। ছোট শিশুদের নিয়মিত হোটেলের খাবার খাওয়ানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। অন্যদিকে মইজ্জার টেক এলাকার অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফরহাদ আলম বলেন, আগে ১০-২০ মিনিটে গ্যাস নেওয়া গেলেও এখন ৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। দিনের বড় অংশ লাইনে কাটায় যাত্রী পরিবহন ও সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে।

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যিক শিল্প খাতে। কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানাসহ (সিইউএফএল) বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাসের ঘাটতির কারণে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। রপ্তানিমুখী পোশাক খাত, ইস্পাত, টেক্সটাইল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো ধারণক্ষমতার অর্ধেকেরও কম সচল রাখতে পারছে।

এর সাথে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় আবাসন থেকে শুরু করে শিল্পাঞ্চলে দিনে-রাতে বারবার লোডশেডিং হচ্ছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, "গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন ও পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের এই সংকট জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা দেবে। তাই দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।"

সংকটের নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। এতে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন অর্ধেকের নিচে নেমে যায়। এর ওপর জাতীয় গ্রিডের সামগ্রিক ঘাটতি মেটাতে চট্টগ্রামের বরাদ্দের একটি বড় অংশ রাজধানী ঢাকায় ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা চট্টগ্রামের স্থানীয় সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।

কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস ডিভিশন) প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী জানান, ১ আগস্টের পর পরিস্থিতি আংশিক স্বাভাবিক হওয়ার কথা থাকলেও প্রেশার ও ফ্লো কমে যাওয়ায় অবস্থা আরও বেগতিক হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত করে চালু করতে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে। ফলে উক্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামবাসীর এই দুর্ভোগ সহজে কাটার কোনো লক্ষণ নেই।


এ সম্পর্কিত আরো খবর