স্টাফ রিপোর্টার
তীব্র গ্যাস সংকটে সমগ্র বাংলাদেশের শিল্প খাতে নেমে এসেছে এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ স্থবিরতা। কোথাও কারখানাগুলোর ভারী ও বড় বড় মেশিন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আবার কোথাও সামান্যতম উৎপাদন বজায় রাখতে অর্ধেক সক্ষমতায় কাজ চালাতে বাধ্য হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। মূল জ্বালানি গ্যাসের মারাত্মক সংকটের সঙ্গে নতুন করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সংকট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও বেশি জটিল থেকে জটিলতর রূপ ধারণ করেছে। দেশের ইস্পাত বা স্টিল, সিমেন্ট, কাচ, টেক্সটাইল, ডাইং, স্পিনিং, তৈরি পোশাক ও প্রতিদিনের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পসহ প্রায় সকল প্রকার গ্যাসনির্ভর শিল্পই এখন মহা সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।
বিগত প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলা এই গ্যাস সংকট চার সপ্তাহে পদার্পণ করে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিনের মোট গ্যাস সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে নেমে এসে পৌঁছায় মাত্র ২০৩ কোটি ঘনফুটে। অথচ এর বিপরীতে দেশে দৈনিক মোট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৩৮৫ কোটি ঘনফুট। হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে প্রতিদিনের ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুটে। শিল্পকারখানার মালিক ও অভিজ্ঞ উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের এই সংকট যদি অতি দ্রুত সুরাহা করা না যায়, তবে উৎপাদন ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক রফতানি—এই প্রধান তিনটি খাতেই অপূরণীয় ও মারাত্মক বড় ধরনের ক্ষতি সাধন হতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিদেশি ক্রেতাদের নির্দিষ্ট সময়ের অর্ডার রক্ষা করা এবং সঠিক সময়সীমার মধ্যে পণ্য জাহাজীকরণ করা নিয়ে সবচেয়ে বড় দুঃশ্চিন্তা ও আশঙ্কার মেঘ জমা হয়েছে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ হঠাৎ থমকে যাওয়ার কারণে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপের মোট ৫৭টি কারখানার সবকটির উৎপাদন একযোগে বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প গ্রুপটির সম্মানিত চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল নিশ্চিত করেছেন যে, ১০ আগস্ট রাত থেকে তাদের সব কারখানার নিয়মিত উৎপাদন কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। চিনি, ভোজ্যতেল, গম, আটা, ময়দা, সুজি, সিমেন্ট, কাগজ, এলপিজি ও পশুখাদ্য বা ফিডসহ নানা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি প্রস্তুত করে থাকে দেশের অন্যতম প্রধান এই মেঘনা গ্রুপ। কেবল নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্যই তাদের ১২টি বিশাল কারখানা নিবেদিত ছিল। মেঘনা গ্রুপের প্রধান মোস্তফা কামাল বলেন, 'বর্তমানে কারখানা সচল রাখার জন্য যতটুকু ন্যূনতম গ্যাস বা চাপ পাওয়া প্রয়োজন, তাও পাওয়া যাচ্ছে না। কারখানায় উৎপাদন শূন্যে নামলেও সারা দেশের বাজারে পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়ে গেছে। ফলে এই জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে পুরো দেশের পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি বিশাল বড় বিপর্যয় তৈরি হতে পারে।' উল্লেখ্য, এই একটি শিল্পগোষ্ঠীতেই ৬৫ হাজারের বেশি কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়মিত কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
অনুরূপভাবে গ্যাসের তীব্র সংকটে টি কে গ্রুপের মোট ২৮টি প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার মধ্যে অন্তত ২০টির কাজ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে। চালু থাকা সামান্য কয়েকটি কারখানাতেও স্বাভাবিক গতিতে উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি নাবিল গ্রুপের প্রায় ২০টি কারখানায় দৈনন্দিন উৎপাদন সক্ষমতা নেমে এসেছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত খরচ বহন করে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে সামান্য উৎপাদন চালু রাখা হলেও এতে পণ্য প্রস্তুতের ব্যয় আকাশচুম্বী হয়ে যাচ্ছে। শিল্প খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা জানাচ্ছেন, গুদামে জমিয়ে রাখা পূর্বের তৈরি পণ্য দিয়ে আপাতত বাজারের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো সম্ভব হলেও নতুন করে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ থাকলে মজুদকৃত মালামাল দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাবে। এতে করে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির চরম সরবরাহের সমস্যা প্রকাশ পেতে পারে।
আঞ্চলিক শিল্পাঞ্চলগুলোর চিত্র আরও বেশি ভয়াবহ। হবিগঞ্জ জেলার প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ প্রায় শূন্যে নেমে আসায় সেখানকার ১৭১টি কারখানার উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে পড়েছে। এই কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রায় দুই লাখের বেশি শ্রমিক ও কর্মচারী হঠাৎ করে কর্মহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। অন্যদিকে শিল্পনগরী গাজীপুরের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই জেলার সাড়ে ৩ হাজার শিল্পকারখানার মধ্যে গ্যাসের তীব্র সংকটে পড়ে প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ কারখানার উৎপাদন শতভাগ বন্ধ রয়েছে; যার সংখ্যা প্রায় ৫২৫টি। আর যেগুলো বড় কারখানা কোনোমতে চালু রয়েছে, সেগুলোরও উৎপাদন স্বাভাবিকের চেয়ে ৪০ শতাংশ কমে গেছে।
একইভাবে নারায়ণগঞ্জের বিসিক ও তৎসংলগ্ন এলাকাগুলোতে গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় নেমে যাওয়ায় প্রায় ৪৫০টি টেক্সটাইল ডাইং কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এসব প্রাথমিক কারখানা থেকে প্রক্রিয়াজাত করা সুতা ও কাপড় সময়মতো না পাওয়ায় তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানা চিরতরে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, প্রাথমিক ডাইং কারখানাগুলো থেকে পর্যাপ্ত কাপড়ের যোগান না আসায় মূল পোশাক কারখানার নিয়মিত রফতানি উৎপাদন কাজ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সাভার ও আশুলিয়ার মতো ব্যস্ততম শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম থাকায় কারখানার বয়লার, ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং বিভাগগুলো চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে চলতি মাসেই এই অঞ্চলটি থেকে কয়েক হাজার শ্রমিককে চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাই করতে হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের নরসিংদী ও মাধবদী এলাকার চিত্র আরও করুণ। এখানকার প্রায় ৮০ শতাংশ টেক্সটাইল, ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য দিয়েছেন স্থানীয় কারখানা প্রতিনিধিরা। ফলে কেবল এই একটি অঞ্চলেই প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের অন্যতম শীর্ষ ইস্পাত প্রস্তুতকারী ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম তাদের ১০টি প্রধান কারখানার সবকটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।
সার্বিকভাবে দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বা বিজিএমইএ-এর দেওয়া হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিংহভাগ পোশাক কারখানায় উৎপাদন কাজ আগের তুলনায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। বিটিএমএ-এর সদস্যভুক্ত সুতা ও বস্ত্রকলগুলোর একটা বড় অংশই পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। আর যেসব কারখানা খোলা রয়েছে, সেগুলোতেও ৩০ শতাংশের বেশি উৎপাদন চালানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে ডেনিম, ডাইং, ফিনিশিং ও স্পিনিংয়ের মতো পুরোদস্তুর গ্যাসনির্ভর খাতগুলো সবচেয়ে বড় ও প্রত্যক্ষ ধাক্কাটি খেয়েছে।
এমতাবস্থায় বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করে কোনোমতে কারখানা সচল রাখার চেষ্টা চালানো হলেও তাতে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বড় শিল্পগোষ্ঠীর কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্যাস না থাকায় তাদের একটি কারখানা সচল রাখতেই দিনে প্রায় ৬৫ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হচ্ছে, যার পেছনের দৈনিক অতিরিক্ত খরচই প্রায় ৭০ লাখ টাকা। এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর জানিয়েছেন, শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘ ও অনিয়মিত লোডশেডিংয়ের দরুন কারখানায় ডিজেল ব্যবহারের হার একলাফে ৩৯০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। একইভাবে স্নোটেক্স গ্রুপের সার্বিক জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১৫০ শতাংশ। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, এভাবে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় বাড়তে থাকলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অন্যান্য পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে লোপ পাবে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএ-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানান, বর্তমান গ্যাস সংকট কেবল নির্দিষ্ট কোনো একক পোশাক খাতের সমস্যা নয়; বরং এটি সমগ্র দেশের জাতীয় অর্থনীতি ও শিল্পায়নের জন্য এক মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে। কারণ পোশাকশিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ যেমন—স্পিনিং, ডাইং ও ফিনিশিং একটার সঙ্গে আরেকটা শৃঙ্খল হিসেবে যুক্ত। কোনো একটি শৃঙ্খল ভাঙলে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। বিশ্ববাজারে এখন বাংলাদেশকে ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশীদের সঙ্গে কঠোর প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হয়। এই সময়ে জ্বালানির অনিশ্চয়তায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বিশ্বাস ও আস্থা হারিয়ে ফেললে তা পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তিনি দ্রুত সরকারকে স্বল্পমেয়াদে গ্যাসের একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি তৈরি করে শিল্পে গ্যাস বণ্টন করার এবং দীর্ঘমেয়াদে নতুন গ্যাস কূপ খনন ও এলএনজি অবকাঠামো জোরদার করার তাগিদ দেন।
উল্লেখ্য, এবারের অভূতপূর্ব গ্যাস সংকটের মূল কারণ মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের দীর্ঘমেয়াদী বিকলতা। গত ২১ জুলাই সেখানে অগ্নিকাণ্ড ও জটিল কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় টার্মিনালটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে জাতীয় গ্রিডে দিনে প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ এক ধাক্কায় কমে যায়। পরে ৬ আগস্ট তা আংশিক সচল হলেও সাগরের বৈরী আবহাওয়া ও নতুন এলএনজিবাহী জাহাজ ভিড়তে না পারায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়। স্বাভাবিক সময়ে দুইটি টার্মিনাল মিলে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দিলেও বর্তমানে তা ৩০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক এবং বিকেএমইএ-এর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক যৌথভাবে মনে করেন, সংকট মোকাবিলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও রফতানিমুখী খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে অবিলম্বে গ্যাস রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা উচিত। কারণ এই জটিল সংকট দ্রুগ সমাধান না হলে শিল্প উৎপাদন কমার সাথে সাথে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যা পরবর্তীতে নগদ অর্থের সংকট, ব্যাংক ঋণের খেলাপি হওয়া এবং ব্যাপক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মতো ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
আকাশজমিন / আরআর