বাংলাদেশ থেকে অবৈধ উপায়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গোল্ডেন ভিসা গ্রহণ ও শত শত কোটি টাকার প্রপার্টি গড়ে তোলার গুরুতর অভিযোগ অনুসন্ধানে নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক তদন্তে সাড়ে চার শ-র বেশি বাংলাদেশির বিরুদ্ধে সেখানে সম্পদের পাহাড় গড়ার তথ্য মেলে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর প্রায় ১০০ জন অভিযুক্ত ব্যক্তির কর সংক্রান্ত নথি, ব্যাংকিং লেনদেন ও প্রপার্টির কাগজপত্র পর্যালোচনার ভিত্তিতে সরেজমিনে চূড়ান্ত তদন্ত চালাতে বিশেষ একটি টিম পাঠাতে প্রস্তুত রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায় ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া ৩ বছর মেয়াদী এই অনুসন্ধানে প্রথম ধাপে ৭০ জন প্রভাবশালীকে শনাক্ত করা হয়েছিল, যার তালিকা পরবর্তীতে অনুসন্ধানের স্বার্থে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) পাঠানো হয়। পরবর্তীতে নতুন করে আরও ২০ থেকে ২৫ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অখণ্ডনীয় নথিপত্র হাতে পায় সংস্থাটি। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সরকারের সাবেক মন্ত্রী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রভাবশালীরা অবস্থান করছেন। তারা সুইস ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক একাধিক ব্যাংক মারফত পাচার করা অর্থ দিয়ে দুবাইয়ের অভিজাত এলাকাগুলোতে আলিশান ভিলা, ফ্ল্যাট এবং কয়েক শত কোটি মূল্যের ভবন ক্রয় করেছেন।
দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেবল কাগজপত্রের ভিত্তিতে দেশীয় প্রশাসনিক তথ্য যাচাই করে অর্থ পাচারের প্রকৃত ব্যাপ্তি উদঘাটন করা অত্যন্ত কঠিন। সম্পত্তির মূল বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ বা প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ, দুবাই ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের অফিশিয়াল রেকর্ড পরীক্ষা, ক্রয়ের উৎস এবং ব্যাংকিং তথ্য যাচাইয়ের জন্য আন্তর্জাতিক পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে দুবাই সফর করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুন কমিশন পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব নেওয়ার পর এই যৌথ প্রতিনিধিদলটি বিশেষ অনুসন্ধানী মিশনে দুবাই পৌঁছাবে।
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজ’ এবং ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরির ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২০ সাল পর্যন্ত অন্তত ৪৫৯ জন বাংলাদেশি গোপনে অর্থ পাচার করে দুবাইয়ে প্রায় ৯৭২টি আধুনিক প্রপার্টি ক্রয় করেন। দাপ্তরিক নথিতে এর আনুমানিক হিসাব সাড়ে ৩১ কোটি মার্কিন ডলার উল্লেখ করা হলেও প্রকৃত বাজারমূল্য এর কয়েক গুণ বেশি। বিশেষ করে দুবাই মেরিনা এবং কৃত্রিম দ্বীপ পাম জুমেইরাহ-র মতো দামি এলাকাগুলোতে শত শত বিলাসবহুল বাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রপার্টি বাংলাদেশিদের দখলে রয়েছে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় দীর্ঘ চিঠি চালাচালির পর এখন সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তায় নথি উদ্ধারের শেষ ধাপে রয়েছে দুদক। দুবাই ল্যান্ড বিভাগ ও স্থানীয় ব্যাংকগুলো থেকে সরাসরি তথ্য সংগৃহীত হলে পাচার করা বিপুল সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণসহ দোষীদের আইনের আওতায় আনা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।