টানা কয়েক মাসের তীব্র মন্দা ও স্থবিরতার পর আবারও জোরেশোরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের জাতীয় সঞ্চয়পত্রের বাজার। ব্যাংকিং খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা, শেয়ারবাজারের দীর্ঘস্থায়ী মন্দা ও অনাস্থা এবং মূলধন রক্ষায় নিরাপদ বিনিয়োগের ক্রমবর্ধমান চাহিদা—প্রধানত এই তিন কারণেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আবারও সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছেন। এর ইতিবাচক প্রভাবে গত এপ্রিলে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ এক লাফে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ২৬০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের মধ্যে একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, অর্থবছরের শুরুর দিকে বিক্রি কিছুটা ইতিবাচক ধারায় থাকলেও মাঝের সময়টাতে টানা কয়েক মাস নিট বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। এমনকি জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত টানা তিন মাস সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি পুরোপুরি ঋণাত্মক ছিল। তবে এপ্রিলে এসে বড় ধরনের ঘুরে দাঁড়ানোয় সঞ্চয়পত্রের সার্বিক বাজার আবারও আশাব্যঞ্জক ধারায় ফিরে এসেছে।
অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা, ফেব্রুয়ারিতে ঋণাত্মক ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা এবং মার্চে নিট বিক্রি আরও নেমে ঋণাত্মক ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকায় ঠেকে। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে নিট বিক্রি হয়েছিল মাত্র ৩৮৫ কোটি টাকা, আর নভেম্বরে তা নেমে গিয়েছিল ঋণাত্মক ২৯৩ কোটি টাকায়। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাস অর্থাৎ জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে বিক্রি ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক ছিল।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত কয়েক মাস ধরে অনেক বিনিয়োগকারী নতুন বিনিয়োগের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। কারণ, সরকার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমিয়ে দিতে পারে—এমন একটা তীব্র আশঙ্কা বাজারে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে আগামী ছয় মাসের জন্য বিদ্যমান মুনাফার হার হুবহু অপরিবর্তিত রাখার সরকারি সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীদের সেই চরম অনিশ্চয়তা কেটে গেছে। ফলে নতুন করে সঞ্চয়পত্রে অর্থ বিনিয়োগে মানুষের আগ্রহ বহুগুণ বাড়ছে। সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮২ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকছে। অর্থ মন্ত্রণালয় গত ২ জুলাই এই সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানতের সুদহার কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও সাধারণ মানুষের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফেরেনি। গত কয়েক বছরের নানা আর্থিক কেলেঙ্কারি, বেশ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের চরম তারল্য সংকট এবং আমানতকারীদের জমানো অর্থ নিয়ে সার্বিক উদ্বেগের কারণে অনেকেই এখনো ব্যাংকে বড় অঙ্কের অর্থ গচ্ছিত রাখতে স্বস্তি বোধ করছেন না। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরেই দেশের শেয়ারবাজারে কাঙ্ক্ষিত কোনো গতি ফেরেনি। ফলে নিজেদের কষ্টার্জিত মূলধন সুরক্ষিত রাখতে নিরাপদ বিনিয়োগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে আবারও জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসছে সঞ্চয়পত্র।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীলতা আসেনি। তাছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের নতুন করে সঞ্চয় করার সক্ষমতাও অনেকটা কমেছে। তবে যাদের কাছে এখনো সামান্য কিছু সঞ্চয় করার সুযোগ রয়েছে, তারা সবচেয়ে নিরাপদ খাতটিকেই বিনিয়োগের জন্য খুঁজছেন। তাঁর মতে, মূলধন হারানোর কোনো ঝুঁকি না থাকা, প্রয়োজনে খুব সহজে ভাঙানো বা নগদায়ন করার সুবিধা এবং অন্যান্য খাতের তুলনায় ভালো মুনাফা পাওয়ার কারণেই সঞ্চয়পত্রে মানুষের আগ্রহ নতুন করে বাড়ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, সঞ্চয়পত্র মূলত সরকারের অভ্যন্তরীণ বাজেট ঘাটতি মেটানোর ঋণের অন্যতম বড় উৎস হলেও বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে সঞ্চয়পত্র থেকে সরাসরি ঋণের প্রয়োজন কিছুটা কমে এসেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছিল। পরবর্তীতে তা কিছুটা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু গত জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে সরকার নতুন করে সঞ্চয়পত্র থেকে যত ঋণ নিয়েছে, তার চেয়ে ৪২৯ কোটি টাকা বেশি আগের ঋণ পরিশোধ বাবদ খরচ করেছে। ফলে এ খাতে সরকারের নিট ঋণ ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। এই বাস্তবতার কারণেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে নতুন বাজেটে সঞ্চয়পত্রের কর ব্যবস্থায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের প্রাপ্ত মুনাফার ওপর সরাসরি ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হয় এবং সেটিকেই চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, উৎসে কেটে রাখা এই কর আর 'চূড়ান্ত কর' বলে গণ্য হবে না। বিনিয়োগকারীকে তাঁর নিজ বার্ষিক আয়কর রিটার্নের মাধ্যমেই এই কর পরবর্তীতে সমন্বয় করতে হবে।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কর কাটা হলে আবেদন করার মাধ্যমে তা পরবর্তীতে ফেরত পাওয়া যাবে। তবে এই নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে ও ভোগান্তিতে পড়তে পারেন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। কারণ, অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর নির্দিষ্ট টিআইএন না থাকায় অতিরিক্ত কাটা কর ফেরত পেতে হলে তাদের নতুন করে টিআইএন সনদ নিতে হবে এবং নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। অন্যদিকে যারা নিয়মিত করদাতা, তারা স্বাভাবিক রিটার্নে আবেদন করেই অতিরিক্ত কেটে নেওয়া কর ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ১২০ দিনের মধ্যে সেই অতিরিক্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবে ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে, সঞ্চয়পত্র বিক্রির ক্ষেত্রে গ্রাহকদের নানাভাবে নিরুৎসাহিত করার অভিযোগ ওঠার পর দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে প্রয়োজনীয় কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক।