অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ডারউইন টেস্টে স্মরণীয় ঐতিহাসিক এক জয় যেন পুরো বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রাতারাতি বদলে দিয়েছে। ঐতিহাসিক এই জয়ের পর অস্ট্রেলিয়ার সাবেক কিংবদন্তি ক্রিকেটারদের নিয়মিত আলোচনার একটা বিশাল অংশজুড়েই এখন স্থান পাচ্ছে বাংলাদেশ দল।
ডারউইন টেস্টে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেওয়ার পর ডেমিয়েন ফ্লেমিং, জেসন গিলেস্পি ও গ্লেন ম্যাকগ্রার জনপ্রিয় 'ফার্স্ট বোলিং কার্টেল' শোতেও স্বাভাবিকভাবেই উঠে এসেছে টাইগারদের এই অভাবনীয় জয়ের গল্প। সেই বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান এবং তারকা পেসার হাসান মাহমুদের চোখধাঁধানো বোলিং ও ব্যাটিং পারফরম্যান্সের প্রশংসায় পুরোপুরি পঞ্চমুখ ছিলেন অজি ক্রিকেট কিংবদন্তিরা।
অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে ডারউইন টেস্টের প্রথম ইনিংসে অসাধারণ এক সেঞ্চুরি হাঁকানো তানজিদের চোখধাঁধানো ব্যাটিংয়ে দারুণ মুগ্ধ হয়েছেন সাবেক অজি ফাস্ট বোলার জেসন গিলেস্পি। টাইগার এই ওপেনারের শট নির্বাচন, নিখুঁত ব্যাটিং টেকনিক ও দারুণ স্ট্রাইক রোটেশনের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, তানজিদের ব্যাটিং টেকনিক আসলেই দেখার মতো দারুণ ছিল। ফুল লেংথের বলে তিনি খুব সাবলীলভাবে সামনের পায়ে ভর দিয়ে খেলেছেন, আর শর্ট বলগুলোতে ব্যাকফুটে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত রান আদায় করেছেন। তিনি মূলত ক্রিকেটের একদম বেসিক টেকনিক মেনে ব্যাটিংটা সম্পন্ন করেছেন। বিশেষ করে যখনই অজি বোলাররা স্টাম্পের কিছুটা বাইরে লুজ বোলিং করেছেন, তখনই তিনি দক্ষতার সাথে ব্যাট চালিয়ে রান তুলেছেন। তানজিদ এক কথায় দারুণ ব্যাটিং করেছেন এবং স্ট্রাইক দারুণভাবে রোটেট করেছেন, তাই এই চমৎকার সেঞ্চুরিটি তার শতভাগ প্রাপ্য ছিল।
তানজিদ প্রথম ইনিংসে ব্যাটে ঝড় তুলে সেঞ্চুরি করলেও ডারউইন টেস্টের মূল নায়ক এবং জয়ের স্থপতি ছিলেন তরুণ ডানহাতি পেসার হাসান মাহমুদ। পুরো ম্যাচে ৯টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট শিকার করে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে নেন তিনি। ম্যাচের প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিতে সবচেয়ে বড় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করেন হাসান, একাই তুলে নেন ৬টি মূল্যবান উইকেট। তার এমন সুইং ও লেংথ বোলিংয়ে মুগ্ধ হয়েছেন সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলার ডেমিয়েন ফ্লেমিং। হাসানের সুনিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের মাঝে তিনি এমনকি অজি কিংবদন্তি গ্লেন ম্যাকগ্রার বোলিংয়ের প্রতিচ্ছবি ও ছায়া খুঁজে পেয়েছেন।
সরাসরি পাশে বসা গ্লেন ম্যাকগ্রাকে সামনে রেখেই ডেমিয়েন ফ্লেমিং বলেন, হাসান মাহমুদ একদম পারফেক্ট লেংথ বজায় রেখে টানা বোলিং করে গেছেন। তিনি ম্যাকগ্রাকে প্রশ্ন রেখে বলেন যে তিনি কোনো হাইলাইট দেখেছেন কি না, কারণ হাসান হুবহু ম্যাকগ্রার মতো নিখুঁত বোলিং করেছেন। পুরো ইনিংসে একটানা দারুণ জায়গায় বল ফেলেছেন, যার ফলে ব্যাটারদের বাধ্য হয়ে সামনে এসে খেলতে হয়েছে এবং বল ঠিক জায়গায় ফেলে অজি ব্যাটারদের কঠিন সমস্যায় ফেলেছেন।
অন্যদিকে কিংবদন্তি গ্লেন ম্যাকগ্রার আলোচনায় উঠে এসেছে দ্বিপক্ষীয় সিরিজের চেয়েও আরও বড় একটি বৈশ্বিক প্রসঙ্গ। উল্লেখ্য, এই চলতি সিরিজের আগে সর্বশেষ ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর অজিদের মাটিতে দীর্ঘ ২৩ বছর দুই দল আর কোনো দ্বিপক্ষীয় টেস্টে মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পায়নি। ম্যাকগ্রার মতানুসারে, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড হয়তো এতদিন ধরে ধরে নিয়েছিল বাংলাদেশ তাদের ঘরের মাঠে ভালো পারফর্ম করতে পারবে না। তাই বাংলাদেশের এমন দাপুটে জয়কে শুধু দুটি দেশের মধ্যকার একটা সাধারণ সিরিজের ফল হিসেবে না দেখে পুরো বিশ্ব ক্রিকেটের জন্যই অনেক বেশি ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে দেখছেন তিনি।
ম্যাকগ্রার নিজস্ব ভঙ্গিতে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেটকে সত্যি খুব ভালোবাসে। দলটি সর্বশেষ তাদের দেশে এসেছে দীর্ঘ ২৩ বছর আগে। অস্ট্রেলিয়া ২৩ বছর বাংলাদেশের সঙ্গে টেস্ট খেলেনি কেবল এই ভেবে যে তারা ভালো করতে পারবে না। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর তারা অস্ট্রেলিয়ায় পা রেখে যেভাবে অলরাউন্ড পারফর্ম করল, তা সত্যি প্রশংসনীয়। এটি বিশ্ব ক্রিকেটের সার্বিক উন্নতির জন্যই দারুণ এক ইতিবাচক বার্তা। বাংলাদেশ যদি সিরিজের শেষ ম্যাচেও নিজেদের এই একই পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারে, তবে সেটি তাদের ক্রিকেট ইতিহাসের জন্য দারুণ কিছু হবে। ডারউইনে টাইগারদের এই জয় তাই কেবল একটি টেস্ট জয়ের গল্পে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আগামী শনিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টেও চোখ থাকবে ভক্তদের।
সূত্র: এএফপি