একটি আইফোনের বকেয়া কিস্তির সামান্য টাকাকে কেন্দ্র করে পারিবারিক তুচ্ছ বিবাদ, আর তা থেকেই জন্ম নিল বুকভাঙা এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। ফোনের স্পর্শে ক্যামেরা চালু থাকা অবস্থাতেই এক তরুণ ও তার বাবা পাহাড়ের চূড়া থেকে সোজা নিচে পড়ে যান। আর চোখের সামনে স্বামী ও পরম আদরের সন্তানকে অতল গিরিখাতে তলিয়ে যেতে দেখে স্থির থাকতে পারেননি মা; তীব্র শোক সহ্য করতে না পেরে তিনিও পাহাড়ের উঁচু চূড়া থেকে নির্মম ঝাঁপ দেন। মুহূর্তেই একই পরিবারের তিনটি প্রাণ শেষ হয়ে যায়। ভারতের মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগর এলাকায় ঘটা হৃদয়বিদারক এই ঘটনার কথা নিশ্চিত করেছে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম
পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, নিহত ওই তরুণের নাম কুনাল। কিছুদিন পূর্বে তিনি কিস্তিতে একটি দামী আইফোন কিনেছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি সেই আইফোনের কিস্তির বা ইএমআই-এর টাকা পরিশোধ করার জন্য পরিবারের কাছে বারবার অর্থ দাবি করছিলেন কুনাল। গত শুক্রবার সকালের দিকে সর্বশেষ কিস্তির টাকা প্রদান করাকে কেন্দ্র করে বাবার সাথে কুনালের তীব্র বাদানুবাদ ও তর্কাতর্কি শুরু হয়। একপর্যায়ে গভীর মানসিক ক্ষোভে ও অভিধানে সকাল ১০টার দিকে কুনাল গৃহ ত্যাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা তিসগাঁও এলাকার একটি উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যান।
কুনাল পাহাড়ে উঠে যাওয়ার দুঃসংবাদ পেয়ে তাকে ফিরিয়ে আনতে ব্যাকুল হয়ে ছুটে যান তার বাবা মুরলিধর চন্দগুড়ে এবং মা সঙ্গীতা। এ সময় পরিস্থিতি দেখে এলাকার স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও তাদের সাহায্য করতে সঙ্গে যোগ দেন। পাহাড়ের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা কুনালকে নিচে নামিয়ে আনতে দীর্ঘ প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ক্রমাগত আকুতি-মিনতি ও বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালান তার মা-বাবা এবং প্রতিবেশীরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, কুনাল যখন চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিল, তখন এক প্রতিবেশী অনুনয় করে তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘অন্তত তোমার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকো।’ জবাবে কুনাল অত্যন্ত বিষণ্ণ কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘না, আমাকে মরতেই হবে। এটাই আমার একমাত্র পথ।’
স্থানীয় সাবেক জনপ্রতিনিধি সঞ্জয় যাদব জানান, উপস্থিত সকলেই কুনালকে বহু অনুনয়-বিনয় করেছিলেন যেন সে এমন সর্বনাশা পথ বেছে না নেয়। তাকে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে এবং মায়ের অশ্রুসজল মুখের দিকে তাকাতেও বারবার অনুরোধ করা হয়েছিল।
কিন্তু কোনো অনুনয়ই কুনালকে মোহিত করতে পারেনি। দুপুর ১টার দিকে ছেলেকে যেভাবেই হোক বাঁচানোর আকুলতায় বাবা মুরলিধর চন্দগুড়ে পাহাড়ের অতি বিপজ্জনক কিনারায় উঠে যান এবং ছেলেকে টেনে নিরাপদ স্থানে নামানোর চেষ্টা করেন। ঠিক তখনই দুর্ভাগ্যবশত দুজনই নিজেদের শারীরিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং প্রায় বহু ফুট নিচে গভীর গিরিখাতে তলিয়ে যান।
চোখের এক পলকে পরম ভালোবাসার স্বামী ও একমাত্র সন্তানকে পাহাড়ের শূন্যতায় হারিয়ে যেতে দেখে মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ চারপাশ স্তব্ধ করে দেয়। কোনো কিছু চিন্তা না করে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সঙ্গীতাও সেই পাহাড়ের চূড়া থেকে সোজা ঝাঁপিয়ে পড়েন নিচে। পরবর্তীতে খবর পেয়ে উদ্ধারকারী পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা পাহাড়ের তলদেশ থেকে তিনজনের রক্তাক্ত ও নিথর মরদেহ উদ্ধার করে। মর্মান্তিক এই ঘটনায় পুলিশ একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে।