ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

মাত্র ৩ টাকায় কেনা বাইসাইকেল: ৮০ বছর ধরে চলছে এক পরিবারের তিন প্রজন্মে


  • আপলোড সময় : সোমবার ২৪ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১০:৫২ এএম

আজ থেকে ঠিক আশি বছর আগে ১৯৪৬ সালে মাত্র তিন টাকা খসিয়ে কেনা হয়েছিল একটি সাধারণ বাইসাইকেল। দীর্ঘ কাল পরিক্রমায় দেখতে দেখতে আটটি দশক পার হয়ে গেলেও সেই ঐতিহাসিক সাইকেলের প্যাডেল ঘোরা কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকেনি। এতগুলো বছর পরও পরম নিখুঁত সচলতায় ঝিনাইদহের গ্রামীণ আঁকাবাঁকা পথে ধুলো উড়িয়ে নিজের রাজত্ব বজায় রেখেছে প্রাচীন এই বাহনটি। কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের সাধারণ কোনো যন্ত্র বা বাহন হিসেবে নয়, বরং একটি ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পরিবারের টানা তিন প্রজন্মের অগণিত সুখ-দুঃখের স্মৃতি, প্রগাঢ় আবেগ এবং সুগভীর ভালোবাসার অনন্য স্মারকচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এটি।

ঐতিহাসিক তথ্য সূত্রে জানা যায়, দেশভাগেরও আগে ১৯৪৬ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ আমলের যশোর শহর থেকে তদানীন্তন তহশিল অফিসের একজন সাধারণ চাকরিজীবী ইউসুফ আলী শেখ মাত্র তিন টাকার বিনিময়ে ইংল্যান্ডের সুপ্রসিদ্ধ ব্র্যান্ড ‘র‍্যালি’-র এই বিশেষ বাইসাইকেলটি ক্রয় করেছিলেন। চাকরি সূত্রে প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত এবং অফিশিয়াল কার্যাদি পালনের জন্য তিনি পরম যত্নে বাহনটি ব্যবহার করতেন। কালের আবর্তে নানা পথ ও হাত ঘুরে সেই মূল্যবান স্মৃতিময় বাইসাইকেলটির বর্তমান মালিক ও চালক হিসেবে প্রতিদিন এটি ব্যবহার করছেন তাঁরই আপন ভাতিজার সুযোগ্য পুত্র ওয়াহেদ আলী শেখ।

বর্তমানে বায়ান্ন বছর বয়সী ওয়াহেদ আলী শেখের স্থায়ী বসবাস ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার চাপালী গ্রামে। তিনি প্রয়াত আনসার আলী শেখের জ্যেষ্ঠ সন্তান। পারিবারিকভাবে চার ভাই ও চার বোনের সুবিশাল সংসারের মধ্যে তিনি সবার বড়। ওয়াহেদ আলী নিজের জীবন অভিজ্ঞতার গল্প শোনাতে গিয়ে জানান, তাঁর প্রয়াত পিতা আনসার আলী শেখ ছিলেন মূলত ইউসুফ আলী শেখের আপন ভাতিজা। ইউসুফ আলী শেখ এবং পাচু শেখ ছিলেন দুই ভাই। পাচু শেখের তিন সন্তানের মধ্যে আনসার আলী ছিলেন অন্যতম।

পারিবারিক ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, সাইকেলটি কেনার প্রায় আট থেকে নয় বছর পর হঠাৎ মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতায় পড়েন তহশিলদার ইউসুফ আলী শেখ। তখন মহামূল্যবান সাইকেলটি তাঁর নিজ বসতবাড়িতেই অনাদরে রাখা ছিল। ইউসুফ আলী তাঁর পরম স্নেহের ভাইঝি জাহারন নেছাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। গভীর স্নেহের টানে একদিন তিনি জাহারন নেছাকে ডেকে সাইকেলটি উপহার হিসেবে তুলে দেন। তবে নারী হওয়ায় জাহারন নেছা নিজে সাইকেলটি চালাতে পারতেন না। ফলে তাঁর আপন ভাই আনসার আলী শেখ সাইকেলটি নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং নিয়মিত চালাতে শুরু করেন।

পেশাগত জীবনে আনসার আলী শেখ ছিলেন একজন অত্যন্ত দক্ষ সাইকেলমিস্ত্রি। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরের ভূষণ স্কুলসংলগ্ন সড়কে এবং পরবর্তীতে গান্না রোডে তাঁর একটি সাইকেল মেরামতের স্বনামধন্য দোকান ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নিজ বাড়ি থেকে শহরের দোকানে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে এই ঐতিহ্যবাহী ইংল্যান্ডের তৈরি বাহনটি ব্যবহার করতেন। একজন অভিজ্ঞ কারিগর হওয়ায় সাইকেলটির খুব যত্ন নিতেন তিনি। মেকানিকাল কোনো ত্রুটি দেখা দিলে নিজ হাতেই তার তাতক্ষণিক মেরামত করতেন। বয়সের ভারে কিছু যন্ত্রাংশ কালক্রমে পরিবর্তন করতে হলেও আশি বছরের পুরোনো সাইকেলটির মূল ফ্রেম বা খাঁচা এখনো আগের মতোই অক্ষত রয়েছে।

আনসার আলীর মৃত্যুর পর সাইকেলের মালিকানা ও চাবি অর্পিত হয় বড় ছেলে ওয়াহেদ আলীর ওপর। পেশায় সাইকেলমিস্ত্রি না হলেও বাবার স্মৃতিবিজড়িত বাহনটির প্রতি তাঁর অনুরাগের কমতি নেই। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে কিংবা দূর-দূরান্তে যেতে হলে এই আশি বছরের পুরোনো বাইসাইকেলটিই হয় তাঁর প্রধান সফরসঙ্গী। ওয়াহেদ আলী গর্বের সাথে জানান যে, বাবার হাত থেকে পাওয়া এই মূল্যবান আমানতটি তিনি পরম যত্নে সচল রেখেছেন এবং আশা করছেন আগামী বহু বছর এই ঐতিহ্যবাহী সাইকেলটি তাঁদের পুরো পরিবারকে এভাবেই নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিয়ে যাবে।

ওয়াহেদ আলীর ছোট ভাই আবদুস সামাদ স্মৃতিচারণ করে বলেন, তাঁদের প্রয়াত বাবা শুধু নিজস্ব চলাচলের জন্য নয়, বরং হাটে-বাজারে বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থেও এই মজবুত সাইকেলটি ব্যবহার করতেন। শুধু তাই নয়, গ্রামীণ প্রতিবেশীরাও বিপদে-আপদে আনসার আলীর কাছ থেকে সাইকেলটি ধার নিয়ে যেতেন এবং কাজ শেষে আবার সঠিক অবস্থায় ফেরত দিতেন। আজ আশি বছর পর দাঁড়িয়েও পরিবারের বাকি ভাইয়েরা জরুরি প্রয়োজনে বাবার স্মৃতির এই সাইকেলেই চেপে বসেন।

চাপালী গ্রামের প্রবীণতম বাসিন্দা পঁচাত্তর বছর বয়সী গোলাম সরোয়ার জানান, সেই ছোটবেলা থেকেই তিনি আনসার আলী শেখকে এই একই বাইসাইকেল চেপে গ্রামে চলাফেরা করতে দেখে আসছেন। আটটি দশক পার হয়ে যাওয়ার পর আধুনিক যুগেও একটি সাধারণ বাহন যেভাবে সম্পূর্ণ সচল রয়েছে, তার মূল রহস্য বলতে গিয়ে প্রবীণ এই মানুষটি এক বাক্যে বলেন—যেকোনো নির্জীব জিনিসের প্রতি যদি মানুষের সঠিক ভালোবাসা, মমতা ও সঠিক যত্ন থাকে, তবে সেই বস্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এভাবে সেবা দিয়ে যেতে পারে। আশি বছর আগে মাত্র ৩ টাকায় কেনা ঐতিহাসিক বাহনটি আজ আর শুধুই ধাতব কাঠামোর বাইসাইকেল নয়, এটি একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের অমর প্রেম ও পারিবারিক বন্ধনের জ্যান্ত প্রতীক।


এ সম্পর্কিত আরো খবর