ছোট সন্তানদের ব্যস্ত রাখতে আইপ্যাড বা স্মার্টফোন হাতে দেওয়া এখন ঘরে ঘরে সাধারণ দৃশ্য। তবে স্ক্রিন বন্ধ করতে বললেই শিশুদের রাগ, চিৎকার কিংবা কান্নার তীব্র প্রতিক্রিয়া অভিভাবকদের নতুন দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। অনেকেই মনে করেন, সন্তানদের এই জেদি আচরণের জন্য সরাসরি আইপ্যাড বা স্মার্টফোনের স্ক্রিন টাইমই দায়ী। প্রযুক্তি জগতের বিখ্যাত ব্যক্তি স্টিভ জবস কিংবা বিল গেটসও একসময় নিজেদের সন্তানদের প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারে লাগাম টেনেছিলেন। বর্তমানে বেশিরভাগ অভিভাবক মনে করেন স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও মগজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কিন্তু সাম্প্রতিককালের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও গবেষণার ফলাফল স্ক্রিন টাইমের ভয়াবহতা নিয়ে একদম নতুন ও ভিন্ন চিত্র সামনে নিয়ে আসছে।
যুক্তরাজ্যের বাথ স্পা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক পিট এটচেলস স্ক্রিন টাইম ও শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে করা বহু বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও তথ্য পর্যালোচনা করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, স্ক্রিনের ভয়ংকর পরিণতি নিয়ে যে প্রচলিত ধারণা রয়েছে, সেটির পেছনে শক্ত বৈজ্ঞানিক কোনো প্রমাণ মিলছে না। ২০২১ সালের এক সমন্বিত গবেষণায় ১৪ জন বিশ্ববরেণ্য বিশেষজ্ঞ ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে প্রকাশিত বহু রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁরা জানান, স্মার্টফোন, গেম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যায় খুবই নগণ্য প্রভাব ফেলে। এমনকি রাতে নীল আলো মেলাটোনিন হরমোন কমায় বলে ঘুমের যে ব্যাঘাতের কথা বলা হয়, ২০২৪ সালের গবেষণায় ঘুমানোর আগে স্ক্রিন দেখার সাথে সার্বিক ঘুমের সমস্যার প্রত্যক্ষ কোনো জোরালো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
গবেষকদের মতে, সমস্যাটি সময় নিয়ে নয়, বরং কনটেন্ট এবং ব্যবহারের ধরনের ওপর নির্ভর করে। কোনো শিশু যদি শিক্ষামূলক কিছু দেখে বা বন্ধুদের সাথে ইতিবাচক যোগাযোগ রাখে, তা আর একটানা নেতিবাচক বার্তা দেখার মতো ক্ষতিকর নয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু প্রজিবিলস্কির তত্ত্বাবধানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সাড়ে ১১ হাজার শিশুর মস্তিষ্কের স্ক্যান পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, স্ক্রিনের সঙ্গে শিশুদের স্মৃতিশক্তি কমা বা স্থায়ী মানসিক ব্যাধির সরাসরি কোনো প্রমাণ নেই। কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস চেম্বার্স উল্লেখ করেন, পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা মানব মস্তিষ্কে সবসময় থাকে। ফলে স্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে মানুষের জ্ঞানীয় বিকাশ হুট করে ভেঙে পড়তে পারে না।
তবে গবেষকেরা সজাগ করেছেন যে, স্ক্রিন টাইম ক্ষতিকর না হলেও অনলাইনে শিশুদের যৌন হয়রানি, গ্রুমিং ও অনাকাঙ্ক্ষিত কনটেন্টের মুখে পড়ার বাস্তব ঝুঁকি কিন্তু রয়েই গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সান দিয়েগো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিন টুয়েঙ্গে যুক্তি দেন, অনলাইনের একাকিত্ব ও মাঠের খেলাধুলা কমে যাওয়ায় সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। সান ডিয়েগোর বিশেষজ্ঞেরা আবার নিয়মিত শারীরিক কসরত ও সামাজিক যোগাযোগকে প্রাধান্য দিয়ে স্ক্রিন সীমিত রাখার পরামর্শ দেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এক বছরের কম শিশুদের স্ক্রিনমুক্ত রাখার সুপারিশ করেছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুদের আধুনিক প্রযুক্তি থেকে একেবারে দূরে না সরিয়ে প্রযুক্তিকে কীভাবে নিরাপদে, ইতিবাচক কাজে ও সুষম ভারসাম্যে ব্যবহার করা যায়—সেই শিক্ষা দেওয়াই অভিভাবকদের জন্য এখন সময়ের প্রধান দাবি।
(সূত্র: বিবিসি)