ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬,  ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
পাকিস্তানের সরকারি হাসপাতালে আগুন, ১৫ শিশুর মৃত্যু চট্টগ্রামে লাখো আশেকে রাসুলের অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য জশনে জুলুস সাম্য ও মানবিকতার আদর্শে সমাজ গড়ার আহ্বান: আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন বেইজিংয়ের নাগালে মস্কোতে আকস্মিক অবতরণ করল মার্কিন সামরিক বিমান থাইল্যান্ডে নোঙর করছে মার্কিন রণতরী আব্রাহাম লিংকন আইএমএফের জনবিরোধী শর্ত থেকে দূরে সরছে সরকার বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ইয়েমেনের হোদেইদায় সরকারি বাহিনীর অভিযানে ১৪ হুথি নিহত বরিশাল-চট্টগ্রামসহ ৫ অঞ্চলে বৃষ্টির শঙ্কা, ১ নম্বর সতর্কতা জারি

আইএমএফের জনবিরোধী শর্ত থেকে দূরে সরছে সরকার


  • আপলোড সময় : বুধবার ২৬ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১০:৪৯ এএম

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আরোপিত কঠোর ও মৌলিক অর্থনৈতিক শর্তগুলো থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে সরকার। বিশ্ব অর্থনীতির গতিশীলতা ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। মূলত ডলারের দর পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করা, মূল্যস্ফীতির হার সন্তোষজনক পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত কঠোর সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখা এবং সুদের হার শিথিল না করার ক্ষেত্রে আইএমএফের বেঁধে দেওয়া আগের বিধিনিষেধগুলো হুবহু মানা হচ্ছে না। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের দর পরিবর্তনের সাথে সাথে জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কৃষির প্রধান উপাদান সারের মূল্য বৃদ্ধি বা পুনঃসমন্বয় করা এবং বিভিন্ন খাত থেকে সরকারি ভর্তুকি ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনার ব্যাপারেও সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো বড় বা জোরালো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার প্রকৃত বা নিট রিজার্ভের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিখুঁত হিসাব নিয়মিত প্রকাশ করা এবং দেশের ভঙ্গুর ব্যাংক খাতের লাগামহীন খেলাপি ঋণ কমানোর পূর্বশর্তগুলো কার্যকর বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। সংস্থাটির এসব কঠোর নির্দেশনা থেকে সরে এসে সরকার সার্বিকভাবে কিছু জনবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে, কারণ আইএমএফের সব প্রস্তাবনা অবিকল মানতে গেলে ভোক্তাসাধারণ ও দেশীয় শিল্প খাতের ওপর সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্প্রতি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করেছেন, দেশের স্বার্থ হানিকর বা সার্বিক জাতীয় অর্থনৈতিক চাহিদার পরিপন্থি এমন কোনো শর্ত মেনে সরকার আইএমএফের সঙ্গে নতুন করে ঋণচুক্তি সম্পাদন করবে না। দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা যায়, দেশে নতুন বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর আইএমএফের কাছে নতুন অর্থায়নের জন্য আনুষ্ঠানিভাবে চিঠি পাঠায় এবং বিগত সরকারের আমলের পুরনো ঋণচুক্তিটি সমঝোতার ভিত্তিতে বাতিল ঘোষণা করে একটি নতুন উপযুক্ত ঋণচুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করে। এরই প্রেক্ষাপটে সংস্থাটির একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই ঢাকা সফর সম্পন্ন করে। ওই প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশের বর্তমান ব্যাংকিং ও সার্বিক অর্থনীতির যাবতীয় ডেটা ও উপাত্ত বিশ্লেষণ ও সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নিয়ে গেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তারা একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করবে এবং বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত নতুন ঋণের নতুন শর্ত নির্ধারণ করবে।

সংগৃহীত তথ্য ও প্রস্তাবিত নতুন শর্তাবলি নিয়ে আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বার্ষিক সভার সাইডলাইনে সরকার ও আইএমএফের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিস্তারিত নীতি-নির্ধারণী আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে এবং মূলত সেখানেই নতুন ঋণ সহায়তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও কৌশল নির্ধারিত হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে আইএমএফের সরাসরি কোনো কার্যকরী ঋণচুক্তি বহাল নেই, কারণ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত ঋণচুক্তিটি নতুন সরকার আইএমএফের সাথে আলোচনার মাধ্যমেই বাতিল করেছে। তবে সংস্থার আর্থিক বিধিমালা অনুযায়ী, পুরনো নেওয়া ঋণের কোনো কিস্তি বা অর্থ পরিশোধ বকেয়া থাকা পর্যন্ত তাদের পূর্বঘোষিত কিছু সাধারণ বাধ্যবাধকতা বহাল থাকে। ফলে পূর্বের ঋণের কিছু সাধারণ বাধ্যবাধকতা মানার সাময়িক দায়বদ্ধতা থাকলেও নতুন চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব অগ্রাধিকার প্রাধান্য পাচ্ছে।

আইএমএফের মূল নির্দেশনাসমূহের মধ্যে অন্যতম ছিল ডলারের বিনিময় হার সম্পূর্ণভাবে খোলা বাজারের চাহিদা ও জোগানের ওপর ছেড়ে দেওয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাজারে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ না করা। কিন্তু মুদ্রা বাজার ও সাধারণ পণ্যের দর স্থীতিশীল রাখার স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত তদারকি চালিয়ে যাচ্ছে। গত আগস্টের শুরুতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার হুট করে বৃদ্ধি পেতে থাকলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে সর্বোচ্চ দর ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা বেঁধে দেওয়ার মৌখিক বার্তা দেওয়া হয়, যার ইতিবাচক ফলস্বরূপ বাজারে দর কমে ১২২ টাকা ৭৭ পয়সায় নেমে আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি হলো, ডলারের দর অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়লে আমদানিকৃত পণ্যের খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। তদুপরি কৃত্রিম কারসাজি রোধে বাজার নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা প্রয়োজন।

একইভাবে দেশের ব্যবসায়িক খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটানোর লক্ষ্যে নীতি সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আইএমএফের শর্তবিরোধী হলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছে সরকার। ভর্তুকি প্রত্যাহারের নির্দেশনার ক্ষেত্রেও সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, যাতে কৃষক ও সাধারণ মধ্যবিত্তের ওপর চাপ না বাড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষেত্রে বর্তমানে স্বল্পমেয়াদি দায় পুরোপুরি বাদ না দিয়ে বিনিয়োগ তহবিল ব্যাতীত গ্রস হিসাব প্রকাশ করা হচ্ছে, যেখানে গ্রস রিজার্ভ ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার এবং বিনয়োগ বাদে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারে। ব্যাংক খাতে আগের লুটপাটের কারণে বৃদ্ধি পাওয়া খেলাপি ঋণ কমানোও এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর